ঢাবিতে ছাত্রলীগের দু’গ্রুপে সংঘর্ষ : আহত ১৫


বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক
ছাত্রলীগের দু’গ্রুপের মধ্যে ফের গোলাগুলি হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। মঙ্গলবার ভোরে হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলে এ ঘটনা ঘটে। এ সময় হল শাখার সহ-সভাপতির কক্ষসহ তিনটি কক্ষে আগুন দেওয়া হয়। কক্ষে থাকা বঙ্গবন্ধুর বাঁধানো একটি ছবিও পুড়ে যায়। ভাংচুর করা হয় প্রায় ২০টি কক্ষ। কয়েক দফা রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে আহত হয়েছে অন্তত ১৫ জন। দা-চাপাতি দিয়ে তাদের আঘাত করা হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় একজনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে আরেকজনকে। বাকিরা বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল সেন্টারে চিকিৎসা নিচ্ছে।
আহতদের দেখতে গেলে দু’গ্রুপের মধ্যে দু’দফা সংঘর্ষ বাঁধে মেডিকেল সেন্টারের সামনে। সংঘর্ষে জড়িত থাকার অভিযোগ পুলিশ দু’জনকে আটক করেছে।
এ ঘটনায় গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে হল প্রভোস্ট অধ্যাপক আক্কাস আলী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. কেএম সাইফুল ইসলাম খান ছাত্রলীগ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। তবে দু’গ্রুপের মধ্যে স্পষ্ট মীমাংসা ছাড়াই বৈঠক শেষ হয়েছে বলে জানা গেছে। এতে আবারও সংঘর্ষের আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে মেডিকেল সেন্টার ও হল এলাকায় পুলিশ মোতায়েন রাখা হয়েছে। এদিকে হল কর্তৃপক্ষ একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, হল কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের সূত্রপাত। হল শাখার সভাপতি মোহাম্মদ আলী ও সাধারণ সম্পাদক নিজেদের আস্থাভাজন কর্মীকে কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করে শক্তি বাড়াতে চেষ্টা করেন। তবে সোমবার রাত পর্যন্ত দুই নেতা কোনো সমঝোতায় পেঁৗছতে পারেননি। এতে রাত ৪টায় দু’গ্রুপের মধ্যে মারামারি বেধে যায়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মঙ্গলবার ভোর ৪টায় আলী গ্রুপ ও মহিউদ্দিন গ্রুপের কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। আলী সমর্থকরা তিনতলা থেকে আর মহিউদ্দিন সমর্থকরা চারতলা থেকে ইট নিক্ষেপ শুরু করে। দু’গ্রুপের কর্মীদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া চলে থেমে থেমে। মারামারিতে আলী গ্রুপের নেতৃত্বে ছিল হল শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক মহিউদ্দিন মাহি (ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগ), রাসেল ও মেহেদী। মহিউদ্দিন গ্রুপের নেতৃত্ব দেয় নিটল, ফারুক ও শাকের।
একপর্যায়ে আলী সমর্থকরা হল শাখার সহ-সভাপতি ইমতিয়াজ বুলবুল বাপ্পীর কক্ষে (১১১) হামলা চালায়। তার কক্ষেও আগুন দেওয়া হয়। এ সময় তার কক্ষে থাকা বঙ্গবন্ধুর একটি বাঁধানো ছবি পুড়ে যায়। ১০৭ ও ১০৯ নম্বর কক্ষেও অগি্নসংযোগ ও ভাংচুর চালানো হয়। একই সময় আলী গ্রুপের আরেকটি অংশ চারতলায় বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সহ-সভাপতি রাশেদুল হাসানের কক্ষে (৪০৬) হামলা চালায়। ভাংচুর করা হয় ৪০১, ৪০১-এ, ৪০১-বি, ৪০২, ৪০৩, ৩১৬, ৩১৭, ৩২৪ নম্বর কক্ষ। মহিউদ্দিন গ্রুপ পাল্টা হামলা চালিয়ে আলী সমর্থকদের ৪০৪, ৫১০, ৫১৬ নম্বর কক্ষসহ বেশকিছু কক্ষ ভাংচুর করে। রাশেদ অভিযোগ করেছেন, ভাংচুর করার সময় তাদের কক্ষ থেকে কম্পিউটার, ল্যাপটপ, মোবাইলসহ নগদ অর্থ লুটপাট করা হয়।
সংঘর্ষ চলাকালে অন্তত ১০ রাউন্ড গুলির শব্দ শোনেন হলে অবস্থানকারী শিক্ষার্থীরা। তবে আহতদের মধ্যে গুলিবিদ্ধ কাউকে পাওয়া যায়নি। পুলিশ অভিযান চালিয়েও কোনো অস্ত্র উদ্ধার করতে পারেনি। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, উভয় গ্রুপই সংঘর্ষের সময় ভীতি তৈরি করতে ফাঁকা গুলি করেছে। গত ফেব্রুয়ারি এফ রহমান হলে এবং জানুয়ারি মাসে মুহসীন হলে ছাত্রলীগের দু’গ্রুপের সংঘর্ষে গোলাগুলি হয়।
ভোর সোয়া ৫টায় হল প্রভোস্ট অধ্যাপক আক্কাস আলী, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. সাইফুল ইসলাম খান, সহকারী প্রক্টর ড. আমজাদ আলী ও পুলিশের উপস্থিতিতে সংঘর্ষ থামে। হলে পুলিশ অভিযান চালালে মহিউদ্দিন গ্রুপের কর্মীরা হল ছেড়ে চলে যায়। পরে আলী গ্রুপের কর্মীরা হলে নিজেদের একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। মহিউদ্দিন গ্রুপের কর্মীদের বেশকিছু কক্ষে তালাও লাগিয়ে দেয় তারা। অবশ্য বিকেলে তালা ভেঙে নিজেদের কক্ষ দখলে নেয় মহিউদ্দিন গ্রুপের কর্মীরা। এ সময় আলী গ্রুপ নিশ্চুপ ছিল। তবে রাতে আবার সংঘর্ষ বাধার আশঙ্কা করছেন অনেকে।
এ ঘটনায় হল কর্তৃপক্ষ আবাসিক শিক্ষক আখতারুজ্জামানকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। এ কমিটি পাঁচ দিনের মধ্যে দোষীদের চিহ্নিত করে প্রতিবেদন তৈরি করবে। এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের হল প্রভোস্ট অধ্যাপক আক্কাস আলী ও প্রক্টর ড. সাইফুল ইসলাম মঙ্গলবার দুপুরে উপাচার্যের বাসভবনে প্রক্টরের কার্যালয়ে ছাত্রলীগ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এ সময় ছাত্রলীগ বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি শেখ সোহেল রানা টিপু, সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ সাকীব বাদশা, সহ-সভাপতি রাশেদুল হাসান, মুহসীন হল শাখার সভাপতি মোহাম্মদ আলী, সাধারণ সম্পাদক মহিউদ্দিন প্রমুখ।
বৈঠক শেষে অধ্যাপক আক্কাস আলী সমকালকে জানান, আধিপত্য বিস্তারের দ্বন্দ্ব থেকে সংঘর্ষ বাধে একটি ছাত্র সংগঠনের হল শাখার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক গ্রুপের মধ্যে। এ নেতারা আর সংঘর্ষ হবে না বলে তাদের আশ্বস্ত করেছেন। তবে জানা গেছে, এ ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই বৈঠক শেষ হয়েছে।
সংঘর্ষের পর ঢাকা মেডিকেলে গুরুতর আহত অবস্থায় ভর্তি রয়েছে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র এনামুল হক। তার কোমরে, পিঠে চাপাতির আঘাত লাগে। অস্ত্রোপচারের পর কর্মরত চিকিৎসক জানান, রোগীর অবস্থা উন্নতির দিকে। এছাড়া এ মেডিকেলে ভর্তি রয়েছে জিয়াউর রহমান (লোকপ্রশাসন/ তৃতীয় বর্ষ), রহমত আলী (ইসলামী শিক্ষা/ প্রথম বর্ষ), ওয়ারেস (মার্কেটিং/ চতুর্থ বর্ষ) এবং মনির হোসেন (ইসলামী শিক্ষা/ দ্বিতীয় বর্ষ)। তাদের মধ্যে মনির সভাপতি গ্রুপের। অন্যরা সাধারণ সম্পাদক গ্রুপের কর্মী। সংঘর্ষের মাঝখানে পড়ে জীবন বাঁচাতে মনির চারতলা লাফ দেয়। এতে সে গুরুতর আহত হয়। তাকে পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
সকাল ৯টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল সেন্টারের সামনে আলী গ্রুপের কর্মীরা আহতদের দেখতে গেলে তাদের ওপর চড়াও হয় মহিউদ্দিন গ্রুপের কর্মীরা। এ সময় আলী গ্রুপের আনসারী শাহীন নামে একজন আহত হয়। কিছুক্ষণ পরে একই স্থানে পাল্টা হামলা চালায় আলী গ্রুপের কর্মীরা। এতে মহিউদ্দিন সমর্থক হল শাখার সহ-সভাপতি মোয়াজ্জেম হোসেন লিটন, সহ-সম্পাদক মিলন ও মামুন হোসেন আহত হয়। এ সময় আলী গ্রুপের রিপন (ফিন্যান্স/ তৃতীয় বর্ষ) এবং বাবুকে (ইংরেজি/ দ্বিতীয় বর্ষ) হাতেনাতে গ্রেফতার করে পুলিশ।
এ ঘটনার বিষয়ে সভাপতি আলী জানান, সাধারণ সম্পাদক শিবিরের নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে রাতে হল দখলের চেষ্টা করেছিল। ছাত্রলীগসহ সাধারণ ছাত্ররা তা প্রতিহত করেছে। তবে সাধারণ সম্পাদক মহিউদ্দিন ঘটনার জন্য সভাপতিকে দায়ী করেছেন। তিনি বলেন, সভাপতির আধিপত্যবাদী মনোভাবের কারণেই এ সংঘর্ষ হয়েছে। রাতে হঠাৎই সশস্ত্র অবস্থায় আক্রমণ চালায় তারা। শিবিরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকার অভিযোগ প্রত্যাখান করেন তিনি।
পাঁচ ছাত্রলীগ কর্মীকে বহিষ্কার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলে সংঘর্ষের ঘটনায় পাঁচ ছাত্রলীগ কর্মীকে বহিষ্কার করা হয়েছে সংগঠন থেকে। হল শাখার সভাপতি মোহাম্মদ আলী ও সাধারণ সম্পাদক মহিউদ্দিনকে কারণ দর্শানো নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার রাতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানান ছাত্রলীগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি শেখ সোহেল রানা টিপু। তিনি বলেন, দুই নেতাকে আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নোটিশের জবাব দিতে হবে। সন্তোষজনক জবাব না পেলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর বহিষ্কৃত কর্মীরা হলো আরাবি, রাজন, অপু, মাহি ও পারভেজ।
তথ্যসূত্র: সমকাল, ৫ মে ২০১০