ইউনিজয় English

৫শ’ কোটি টাকার টেন্ডার অনিয়ম

7-03-10.jpg
shomokal.jpg
আশরাফ খান
গত এক বছরে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার ৪৫টি কাজে টেন্ডার আহ্বান থেকে কার্যাদেশ দেওয়া পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে অনিয়ম-দুর্নীতির ঘটনা উদ্ঘাটিত হয়েছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট টেকনিক্যাল ইউনিট (সিপিটিইউ) এ অনিয়ম ও দুর্নীতি উদ্ঘাটন করেছে। এসব কাজের ২৫টিই সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের। বাকিগুলো এলজিইডি, কৃষি, শিল্পসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, দফতর ও সংস্থার অবকাঠামোগত নির্মাণ কাজ। নির্বাহী প্রকৌশলী, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, প্রকল্প পরিচালকসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ব্যক্তিগত পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ দিতে এসব ক্ষেত্রে অনিয়মের আশ্রয় নিয়েছেন। সিপিটিইউর রিভিউ কমিটির পর্যবেক্ষণে ধরা পড়েছে, দরপত্রে অংশগ্রহণকারীদের সঙ্গে কর্মকর্তাদের যোগসাজশেই এগুলো হয়েছে। নেপথ্যে ব্যক্তিগত স্বার্থ জড়িত বলে তাদের আশঙ্কা।
এর মধ্যেই সরকার দুই কোটি টাকা পর্যন্ত কাজের দরপত্র লটারির মাধ্যমে করানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। উন্নয়ন সহযোগীদের প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও গত সপ্তাহে মন্ত্রিসভার বৈঠকে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অ্যাক্টের (পিপিএ) আওতায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বর্তমানে ৫০ লাখ টাকায় সীমিত দরপত্র লটারির মাধ্যমে দেওয়ার সুযোগ আছে। এ সুযোগ দুই কোটি টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হলে উন্নয়ন কাজে দুর্নীতির প্রসার ঘটবে বলে উন্নয়ন সহযোগীরা মনে করে। তারা বলছে, এ ধরনের ব্যবস্থায় প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের পরিবর্তে নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের মধ্যে উন্নয়ন কাজ ভাগাভাগির সুযোগ অবারিত হবে। দুর্নীতি বাড়বে। যদিও যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন এর সঙ্গে ভিন্নমত প্রকাশ করেছেন। তার মতে, এতে ঠিকাদারদের মধ্যে কাজ ভাগাভাগি হোক বা না হোক, উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে অধিকসংখ্যক ঠিকাদারের অংশগ্রহণ বাড়বে। নতুন ঠিকাদাররা আসতে পারবে। তিনি সমকালকে বলেন, এ ব্যবস্থায় কাজের মান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা নেই। বিশ্বব্যাংকসহ উন্নয়ন সহযোগীদের আপত্তিরও কিছু নেই। শুধু সরকারের নিজস্ব অর্থে বাস্তবায়ন করা প্রকল্পের ক্ষেত্রেই এ ব্যবস্থা কার্যকর হবে বলে তিনি জানান।

জানা গেছে, কোনো টেন্ডার বা দেশি-বিদেশি ক্রয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ত্রুটি, অনিয়মের অভিযোগ থাকলে পিপিএতে তার প্রতিকারের বিধান রয়েছে। কেউ সংক্ষুব্ধ হলে প্রথমে টেন্ডার আহ্বানকারী কর্মকর্তাদের কাছে সুবিচার চাওয়ার সুযোগ রয়েছে। এতে সন্তুষ্ট না হলে তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রধানের কাছে প্রতিকার চাইতে পারেন। এতেও প্রতিকার পাওয়া যায়নি মনে করলে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি মন্ত্রণালয় বা বিভাগীয় সচিবের কাছে অভিযোগ করতে পারেন। কোনো পর্যায়েই প্রতিকার না পাওয়ায় ৪৫টি দরপত্রে অংশগ্রহণকারী ৪৫ সংক্ষুব্ধ প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে রিভিউ কমিটির কাছে অভিযোগ করা হয়। রিভিউ কমিটির প্রধান একজন অবসরপ্রাপ্ত সচিব। একজন অবসরপ্রাপ্ত জজ বা আইনজীবী/এফবিসিসিআইর প্রতিনিধি কমিটিতে সদস্য হিসেবে রয়েছেন। রিভিউ কমিটি রেকর্ডপত্র পর্যালোচনা ও সংক্ষুব্ধ প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের শুনানি করে ৪৫টি প্রকল্পের ক্ষেত্রে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির ঘটনা উদ্ঘাটন করে। সুনির্দিষ্টভাবে কারণ না দেখিয়ে ঢালাওভাবে পিপিএ সঠিকভাবে অনুসরণ না করা, বিভিন্ন ডকুমেন্ট না থাকা ও ঠিকমতো জমা না দেওয়া, এমনকি ৩০০ টাকার স্থলে ১৫০ টাকার স্ট্যাম্প দেওয়ার মতো ছোটখাটো ত্রুটির অজুহাতেও দরপত্র বাতিল বা সর্বনিম্ন দরদাতাকে বঞ্চিত করা হয়। রিভিউ কমিটি তার পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেছে, ছোটখাটো ত্রুটি শোধরানোর সুযোগ পিপিএতে দেওয়া রয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের সে সুযোগ না দিয়ে তাদের দরপত্র বাতিল করায় দুর্নীতি বিস্তৃত ও উন্নয়ন কার্যক্রম মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। রিভিউ কমিটি যেসব অভিযোগ পর্যালোচনা করেছে, তার অন্যতম হাজীপুর ব্রিজ নির্মাণ কাজ।

কুয়াকাটা-বরিশাল সড়কে ৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ২৭০ মিটার দীর্ঘ হাজীপুর ব্রিজ নির্মাণে আহূত দরপত্রে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতা ছিল যৌথভাবে আনোয়ার হোসেন ও তার সহযোগী প্রতিষ্ঠান। সর্বনিম্ন দরদাতার অফার রেসপনসিভ না হওয়ায় প্রথম স্থানের দরদাতা বাদ পড়ে। দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতা আনোয়ার হোসেনের ২৬০ মিটার সেতু নির্মাণের অভিজ্ঞতা রয়েছে। কাজের শর্ত অনুযায়ী নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের ২৭০ মিটার সেতু নির্মাণের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। তার সহযোগী সংস্থার ৩১০ মিটার সেতু নির্মাণের অভিজ্ঞতা ছিল। যৌথ দরদাতা হিসেবে তাদের অভিজ্ঞতা যথাযথ বিবেচনা করার কথা। কিন্তু সওজের নির্বাহী ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী তা বিবেচনায় না নিয়ে তাদের বাদ দিয়ে চতুর্থ সর্বনিম্ন দরদাতা এমএম বিল্ডার্সকে কার্যাদেশ দেয়। অথচ দ্বিতীয় ও চতুর্থ সর্বনিম্ন দরদাতার মধ্যে দরের পার্থক্য ছিল ৩ কোটি ২১ লাখ টাকা। সংক্ষুব্ধ দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতা সিপিটিইউর রিভিউ কমিটিতে অভিযোগ করলে তারা তা গ্রহণ করেন এবং চতুর্থ সর্বনিম্ন দরদাতাকে দেওয়া কার্যাদেশ বাতিল করেন।

কুয়াকাটা-বরিশাল সড়কের মহিপুর ব্রিজ নির্মাণ প্রকল্পেও দুর্নীতির আশ্রয় নেওয়া হয়। ৭০ কোটি টাকার এ ব্রিজ নির্মাণে সমপরিমাণ অর্থের কাজের পূর্ব অভিজ্ঞতা থাকার শর্ত রয়েছে। গত ডিসেম্বরে ব্রিজের দরপত্র আহ্বান করা হয়। পিপিএ অনুযায়ী দরপত্র জমা দেওয়ার আগের দিন পর্যন্ত ঠিকাদারের অভিজ্ঞতা ধরতে হবে। কিন্তু সওজ কর্তৃপক্ষ গত জুলাই-জুন অর্থবছরকে অভিজ্ঞতা অর্জনের সময়কাল হিসেবে ধরে। এতে সর্বনিম্ন দরদাতা হয় এমএম হোসেন নামের একটি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান। তার ডিসেম্বর পর্যন্ত কাজের অভিজ্ঞতাকে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। অথচ এ সময়টা ধরা হলে তার কাজের অভিজ্ঞতা হতো ৭৪ কোটি টাকার। তাকে বাদ দিয়ে ১ কোটি ৫৪ লাখ টাকা বেশি দরে চতুর্থ সর্বনিম্ন দরদাতাকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। রিভিউ কমিটি এ কার্যাদেশ বাতিল করে সর্বনিম্ন দরদাতাকেই কার্যাদেশ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। গত এক বছরে এ ধরনের ৪৫টি ঘটনা ঘটেছে। এ দরপত্রগুলোতে কাজ হচ্ছে ৫০০ কোটি টাকার। এতে সর্বনিম্ন দরদাতাদের বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় বাদ দিয়ে প্রকৌশলী ও নির্মাণ প্রতিষ্ঠানগুলো বাড়তি দরে কাজের সুযোগ দেওয়ায় প্রায় ৭০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটে। এসব দুর্নীতি ধরা পড়ার পরও একটি ঘটনায়ও দায়ী প্রকৌশলী বা প্রকল্প পরিচালকের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এদিকে দুই কোটি টাকা পর্যন্ত লটারির ব্যবস্থা করায় দুর্নীতির ক্ষেত্র ও মাত্রা বাড়ার সুযোগ হয়েছে। বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলীরা জানান, ২০ কোটি টাকার কাজ দুই কোটি টাকা করে ১০টি গ্রুপে ভাগ করে নির্দিষ্ট কিছুসংখ্যক ঠিকাদারকে দেওয়ার সুযোগ এতে অবারিত হয়েছে। ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশে নির্বাহী প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালকরা বর্ধিত হারে প্রকল্প ব্যয়ের প্রাক্কলন করে নেবেন, যা যাচাই করার কোনো ব্যবস্থা রাখা হয়নি। এতে প্রকল্প ব্যয় বেড়ে যাবে। অন্যদিকে কাজের মান নিশ্চিত করারও উপায় থাকবে না। যে প্রকৌশলী, প্রকল্প পরিচালক অতিরিক্ত অর্থের প্রাক্কলন করবেন, তারাই এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করবেন।

তথ্যসূত্র: সমকাল, ৭ মার্চ ২০১০

কোন মন্তব্য নেই

মন্তব্য যোগ করুন


ইউনিজয় ফোনেটিক প্রভাত English