১০ ট্রাক অস্ত্র মামলায় হাফিজের জবানবন্দি

ডিজিএফআই, এনএসআইসহ প্রশাসনের ঊধর্বতন কয়েক কর্মকর্তার নাম প্রকাশ
রাষ্ট্রযন্ত্র দায় এড়াতে পারে না
তপন চক্রবর্তী: চট্টগ্রামে আলোচিত ১০ ট্রাক অস্ত্র চোরাচালান মামলায় আদালতে দ্বিতীয় দফায় দেয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে মামলার প্রধান আসামি হাফিজুর রহমান তৎকালীন সরকারের দুই গোয়েন্দা সংস্থাসহ ঊধর্বতন কর্মকর্তাসহ মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী সরাসরি জড়িত ছিলেন বলে উল্লেখ করে বলেন, তৎকালীন রাষ্ট্রযন্ত্র এর দায় এড়াতে পারে না।
হাফিজ বলেন, সরকারের সেই সময়কার প্রশাসন তথা গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই এবং এনএসআইয়ের সরাসরি তত্ত্বাবধানে অস্ত্র চালান খালান হয়েছে। তার এ জবানবন্দিতে এ দুই গোয়েন্দা সংস্থার বেশকিছু কর্মকর্তাসহ প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তার নামও তিনি প্রকাশ করেন। ২০০৫ সালে গ্রেফতারের পর বিএনপির চারদলীয় জোট সরকারের সময় তিনি উল্লেখিত তথ্য প্রকাশ করতে চাইলে ওই সময় এসব তথ্য প্রকাশ করলে তাকে ক্রসফায়ারে মেরে ফেলার হুমকি দেয়া হয় বলে জানান। ২০০৯ সালের ২ মার্চ হাফিজুর রহমান আদালতে এ মামলার প্রথম জবানবন্দি দেন।
হাফিজুর রহমান তথ্য দিয়ে জানান, এ অস্ত্র চালানের সঙ্গে গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই ও এনএসআইয়ের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা জড়িত। এসব গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তাদের তত্ত্বাবধানে অস্ত্র চালান খালাস হয়েছে। সেই গোয়েন্দা কর্মকর্তার সঙ্গে তৎকালীন সরকারের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও পদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে এ বিষয়ে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ ছিল বলে তিনি শুনেছেন বলে জানান। হাফিজ নিজেকে এ কাজে একজন কুলি দাবি করে তথ্য দেন যে, রাষ্ট্রযন্ত্র যেখানে সরাসরি জড়িত ছিল সেক্ষেত্রে এখানে তার ভূমিকা অত্যন্ত গৌন।
গত শনিবার বিকেল পাঁচটা থেকে পৌনে একটা পর্যন্ত প্রায় পৌনে ৮ ঘন্টা ধরে হাফিজের ৪৩ পৃষ্ঠার দ্বিতীয় দফার এ জবানবন্দি রেকর্ড করেন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মাহবুবুর রহমান। গত ১৪ জানুয়ারি সিআইডির আবেদনে আদালত তাকে তিনদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করলে ৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় নিয়ে জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেলে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ চালানো হয়। আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে রাজি হলে তাকে শনিবার চট্টগ্রাম জুডিশিয়াল আদালতে হাজির করা হয়।
হাফিজুর রহমান জবানবন্দিতে বলেন, কোস্টগার্ডের জাহাজ থেকে আলো ফেলে ট্রলার সিইউএফএল জেটিতে ভেড়াতে সহায়তা করে। জাহাজ থেকে ট্রলারে অস্ত্র খালাসকালে উলফা নেতা পরেশ বড়-য়া উপস্থিত থেকে সবকিছু তদারকি করেন। তবে সিইউএফএল জেটিতে খালাসকালে পরেশ বড়-য়া উপস্থিত ছিলেন না দাবি করে তিনি বলেন, জেটিতে অস্ত্র খালাসকালে পুলিশের সার্জেন্ট আলাউদ্দিন বাধা দিলে এ ব্যাপারে তাৎক্ষণিক তিনি উলফা নেতা পরেশ বড়-য়াকে ফোনে জানান। এ সময় উলফা নেতা তাকে জানান- ডিজিএফআই, এনএসআই প্রধানসহ প্রশাসনের ঊধর্বতন কর্মকর্তাদের জ্ঞাতসারে এ অস্ত্র চালান খালাস হচ্ছে। সার্জেন্ট আলাউদ্দিনকে বেশি বাড়াবাড়ি না করার জন্য বলতে বলেন।
এদিকে অস্ত্রের চালান বহনকারী জাহাজ থেকে অস্ত্র খালাসের কার্যক্রম হাফিজ নিজে প্রত্যক্ষ করলেও এবারের জবানবন্দিতেও জাহাজের ব্যাপারে কোনো তথ্য দিতে পারেননি। হাফিজ বলেন, টেকনাফের সেন্টমার্টিনের অদূরে একটি জাহাজ থেকে অস্ত্র চালান দুটি ট্রলারে খালাস করার সময় জাহাজটি জলদস্যুর কবলে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিলে কোস্টগার্ডকে তা অবহিত করা হয় এবং কোস্টগার্ড-এর ধাওয়ায় জলদস্যুরা পালিয়ে যায়। রাতে অস্ত্র বহনকারী জাহাজটি তিনি ভালোভাবে দেখেননি। তার ওই জাহাজটি ব্যবহার অযোগ্য পুরনো বলেই মনে হয়েছে। জাহাজের নাবিকেরা চীনা ও ইংরেজি ভাষায় কথা বলেছে বলে তিনি জানান।
প্রসঙ্গত অস্ত্র চালান আটক করার সময়ে এনএসআইয়ের প্রধান ছিলেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবদুর রহিম। অস্ত্র মামলায় গ্রেফতার হয়ে বর্তমানে তিনি কারাগারে আছেন। জবানবন্দিতে তিনি অস্ত্র চালানের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক এআরওয়াই শিল্প গ্রুপ ও বিদেশি একটি গোয়েন্দা সংস্থার সংশিস্নষ্টতার বিষয়ে তথ্য দেন। ওই সময় ডিজিএফআইয়ের প্রধান ছিলেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাদেক হাসান রুমি। ডিজিএফআইয়ে কাউন্টার ইন্টালিজেন্স বুরোর (সিআইবি) দায়িত্বে ছিলেন মেজর জেনারেল (অব.) রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী। পরবর্তীতে তিনি এনএসআইয়ের ডিজি নিযুক্ত হন। তিনিও গ্রেফতার হয়ে বর্তমানে জেলে আছেন। তার কাছ থেকে থেকে এ পর্যন্ত সিআইডি গুরুত্বপূর্ণ কোনো তথ্য পায়নি। পুনরায় রেজ্জাকুল হায়দারকে সিআইডি এরই মধ্যে সাতদিনের রিমান্ডে নেয়ার আবেদন জানিয়েছে সিআইডি। আজ সোমবার আদালতে এই আবেদনের শুনানি অনুষ্ঠিত হবে।
সিআইডি সূত্র জানায়, হাফিজের জবানবন্দিতে গোয়েন্দা সংস্থা ও পুলিশের কয়েকজন ঊধর্বতন কর্মকর্তার নাম এসেছে। শিগগিরই তাদের গ্রেফতারে অভিযান চালানো হবে। সম্পাদনা: শাম্মী আক্তার
তথ্যসূত্র: আমাদের সময়, ৮ ফেব্রুয়ারি ২০১০