ছাত্রলীগের কোন্দলের শিকার সাধারণ ছাত্র, ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মৃত্যুকলঙ্ক
নিজস্ব প্রতিবেদক |
ছাত্রলীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষের কারণে প্রাণ দিতে হলো সাধারণ ছাত্র আবু বকর ছিদ্দিককে। গত সোমবার গভীর রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের এ এফ রহমান ছাত্রবাসে মাথায় আঘাত পেলে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। গতকাল বুধবার সকালে বকর মারা যান। তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে সাধারণ শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ-ভাঙচুর করেন। তাঁদের সঙ্গে পুলিশেরও সংঘর্ষ হয়।
ওই রাতে বকরের কক্ষে অবস্থানকারী তাঁর সহপাঠীরা দাবি করেছেন, তাঁর মাথায় পুলিশের ছোড়া গুলি লেগেছে। পুলিশ বলেছে, তারা ওই রাতে কোনো গুলি করেনি। টিয়ার গ্যাসের শেল ছুড়েছে। আর চিকিত্সকেরা বলেছেন, বড় ধরনের আঘাতে বকরের মাথার পেছনের হাড় ভেঙে গেছে।
এর আগে ক্যাম্পাসে ২০০৪ সালে ছাত্রদলের অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষে সংগঠনটির নেতা মাহাবুবুল আলম ওরফে খোকন মারা যান। এবার প্রশ্নবিদ্ধ ছাত্র রাজনীতির করুণ শিকার হলেন একজন সাধারণ ছাত্র। আবার মৃত্যুর কালিমায় কলঙ্কিত হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
আবু বকর ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন। থাকতেন হলের ৪০৪ নম্বর কক্ষে। প্রথম দুই বছরের ফলাফলে তাঁর অবস্থান ছিল প্রথম শ্রেণীতে দ্বিতীয়। তবে তৃতীয় সেমিস্টারে তিনি রেকর্ড নম্বর পেয়েছিলেন।
গতকাল সকাল সাড়ে নয়টায় আবু বকরের মৃত্যুর খবর ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে পড়লে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন তাঁর সহপাঠীসহ সাধারণ শিক্ষার্থীরা। সকাল ১০টা থেকে তাঁরা ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল ও ভাঙচুর শুরু করেন। পুলিশ বাধা দিলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ে। সাধারণ ছাত্রদের বিক্ষোভ ঠেকাতে তত্পর ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের নেতারাও। তাঁরা মল চত্বরসহ বিভিন্ন জায়গায় সাধারণ ছাত্রদের মিছিলে বাধা দেন, ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করেন।
ছাত্রদের সঙ্গে পুলিশের পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস (টিয়ার শেল) নিক্ষেপ করে। দুপুর একটা পর্যন্ত পুলিশ ও ছাত্রদের মধ্যে থেমে থেমে সংঘর্ষ চলে। ছাত্ররা বেশ কয়েকটি গাড়ি ও প্রক্টরের কার্যালয় ভাঙচুর করেন।
সোমবার ভোরে আহত আবু বকরকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। চার ঘণ্টা ধরে চলে তাঁর অস্ত্রোপচার। মঙ্গলবার থেকেই গুজব ছড়িয়ে পড়ে, আবু বকর মারা গেছেন। ওই দিন বিকেলে একবার জ্ঞান ফেরে তাঁর। তবে রাতে তাঁর অবস্থার অবনতি হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা গতকাল সকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজে যান। তারপর সকাল নয়টা ২০ মিনিটে কর্তব্যরত চিকিত্সক শফিকুল আলম বকরকে মৃত ঘোষণা করেন। চিকিত্সকেরা জানান, মাথার পেছনের অংশে বড় ধরনের আঘাতের কারণে সৃষ্ট ‘সাব-ডিউরাল হ্যামারেজে’ বকরের মৃত্যু হয়েছে। তবে আঘাতটি কিসের, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
উপাচার্য প্রথম আলোকে বলেন, ‘যেভাবেই হোক, আমি এটাকে হত্যাকাণ্ডই বলব। আমি বরাবরই ছাত্র রাজনীতির পক্ষে। কিন্তু ছাত্র রাজনীতির নামে মাস্তানি চলতে দেওয়া যায় না।’ তিনি জানান, এ ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। ১৫ দিনের মধ্যে এ কমিটিকে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। দোষী ব্যক্তিদের কঠোর শাস্তি দেওয়া হবে।
উপাচার্য বলেন, ‘আবু বকরকে আমরা ফিরিয়ে দিতে পারব না। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাঁর পরিবারকে সর্বোচ্চ সহায়তা দেবে।’
গত রাতে বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেটের সভায় বকরের মৃত্যুতে শোক ও নিন্দা প্রকাশ করে ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার ও শাস্তি দিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। সহ-উপাচার্য হারুন-অর-রশিদকে আহ্বায়ক করে নয় সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়।
বিক্ষোভ: সকাল থেকেই ক্যাম্পাসের বিভিন্ন পয়েন্টে অতিরিক্ত পুলিশ ও দাঙ্গা পুলিশ মোতায়েন করা হয়। ক্যাম্পাসে যান চলাচল সীমিত করে দেওয়া হয়। বকরের মৃত্যুর খবর জানা গেলে ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে জড়ো হওয়া বকরের সহপাঠীরা মিছিল নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে আসেন। মিছিল থেকে রোকেয়া হলের সামনে কয়েকটি গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। একই সময়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে আরেকটি মিছিল বের হয়। ওই মিছিল উপাচার্যের বাসভবনের কাছে গেলে পুলিশের সঙ্গে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও ইট ছোড়াছুড়ি হয়। মিছিল ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের কয়েকটি শেল ছোড়ে। একদল ছাত্র বেলা ১১টার দিকে প্রক্টরের কার্যালয় ভাঙচুর করেন। এর পরই কলা ভবনের ভেতরের কলাপসিবল ফটকগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। প্রগতিশীল ছাত্রজোটসহ বাম সংগঠনগুলো বিক্ষোভ মিছিল বের করে। মিছিল থেকে হত্যাকারীদের বিচার ও হলগুলোতে প্রশাসনের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার দাবি জানানো হয়। সংঘর্ষ চলাকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর দিয়ে গাড়ি চলাচল বন্ধ করে দেয় পুলিশ।
দুপুর দেড়টার দিকে স্বজনেরা আবু বকরের লাশ নিয়ে তাঁর গ্রামের বাড়িতে রওনা হয়। এর ১৫ মিনিট পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের পথগুলো যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়। ঢাকা মহানগর পুলিশের রমনা অঞ্চলের উপকমিশনার কৃষ্ণপদ রায় বলেন, পুলিশ পরিস্থিতি শান্ত রাখার সর্বাত্মক চেষ্টা করেছে।
কীভাবে মারা গেলেন বকর: সোমবার রাতে এ এফ রহমান হলের সভাপতি সাইদুজ্জামান ফারুক ও সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসানের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। রাত দেড়টা থেকে ভোর পর্যন্ত ওই সংঘর্ষ চলে। উভয় পক্ষ রামদা, চাপাতি, পাইপ, লাঠি, হকিস্টিক নিয়ে একে অপরের ওপর হামলা চালায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে। আহত হন ৩০ জন। এ সময় আবু বকর ৪০৪ নম্বর কক্ষেই ছিলেন।
প্রত্যক্ষদর্শী আবু বকরের রুমমেট ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের ছাত্র মাহবুবুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা সবাই কক্ষে ছিলাম। কক্ষের সামনে ছাত্রলীগের একটি পক্ষ স্লোগান দিচ্ছিল। রাত তিনটার দিকে আমাদের কক্ষের সামনে পুলিশ আসে এবং জানালা দিয়ে আমাদের কক্ষে চার-পাঁচটি টিয়ার শেল ছোড়ে। অন্ধকার হয়ে যায় পুরো কক্ষ। শেলের আঘাতে দেয়াল ফেটে যায়। আমরা টিয়ার শেল থেকে বাঁচতে ব্যালকনিতে আশ্রয় নিই।’
মাহবুবুল আরও বলেন, ‘আমরা যখন ব্যালকনিতে, তখন নিচে প্রক্টর স্যারকে দেখতে পাই। আমরা বলি, ‘স্যার, আমাদের বাঁচান। এ সময় আমাদের ওপরের তলার ৫০৩ নম্বর কক্ষে ছিল পুলিশ। আমাদের চিত্কার শুনে পুলিশ আমাদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। এতে আবু বকরের মাথা ফেটে রক্ত বের হতে থাকে। আমরা কক্ষে ঢুকে পানি এনে বকরের মাথায় পানি দিই। একপর্যায়ে আমরা প্রক্টরকে জানাই, স্যার, একটা অ্যাম্বুলেন্স লাগবে। অ্যাম্বুলেন্স এলে বকরকে ঢাকা মেডিকেলে নেওয়া হয়।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর কে এম সাইফুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেছেন, ‘সেদিনের ঘটনা ছিল ভয়াবহ। দুই পক্ষ পরস্পরকে আক্রমণ করছে। চোখের সামনে হলের সাধারণ সম্পাদক মেহেদীর মাথা ফেটে রক্ত বের হতে থাকে। আরও অনেকে আহত হন। আমরা শত চেষ্টা করেও স্বাভাবিক করতে পারিছলাম না।’ আবু বকরের আহত হওয়া সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘বকর তাঁর কক্ষের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল। পঞ্চম তলা থেকে কেউ পাথর বা লোহার রড ছুড়ে মারে। এর আঘাতে তার মাথার পেছনের অংশে বড় ধরনের জখম হয়।’ তিনি বলেন, ‘চিকিত্সক ও পুলিশের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, টিয়ার শেলের আঘাতে এত বড় ক্ষত হতে পারে না।’ গুলি লেগেছিল কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে এসেছে, ভারী কিছুর আঘাতে বকরের মৃত্যু হয়েছে।’
ঢাকা মহানগর পুলিশের রমনা অঞ্চলের উপকমিশনার কৃষ্ণপদ রায় প্রথম আলোকে বলেন, ‘পরিস্থিতি সামাল দিতে সে রাতে বাধ্য হয়ে কাঁদানে গ্যাস ছোড়া হয়েছিল। পুলিশ কোনো গুলি ছোড়েনি। তবে ঢিল বা কোনো আঘাতে বকরের মৃত্যু হতে পারে।’
আবু বকরের শরীরে অস্ত্রোপচারকারী স্নায়ু ও শল্য (নিউরোসার্জারি) বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আসিফ মোয়াজ্জেম বরকতউল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, বকরের মাথার হাড় ভাঙা ছিল। মগজের পর্দা থেঁতলানো ছিল। মগজও ছিল ফোলা। রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। বরকতউল্লাহ বলেন, অস্ত্রোপচারের সময় বকরের মাথায় স্প্লিন্টার বা ধাতব কোনো পদার্থ পাওয়া যায়নি।
গতকাল দুপুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে আবু বকরের লাশের ময়নাতদন্ত হয়। ময়নাতদন্তের সঙ্গে সম্পৃক্ত সূত্র জানায়, তাঁর মাথা কিংবা শরীরে কোনো স্থানে স্প্লিন্টার বা ধাতব কোনো পদার্থ পাওয়া যায়নি। মাথায় আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। আঘাতের কারণেই মৃত্যু হয়েছে।
নোংরা রাজনীতির বলি আবু বকর: এফ রহমান হলের একাধিক ছাত্রের দাবি, ছাত্রলীগের নোংরা রাজনীতির শিকার আবু বকর। হলের সিট দখল আর নিজেদের শক্তির প্রদর্শন করতে গিয়েই সেদিন সংঘর্ষে জড়ায় ছাত্রলীগ।
ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি মাহমুদ হাসান বলেন, এ এফ রহমান হলে সংঘর্ষের ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত তা খতিয়ে দেখা হবে। এরই মধ্যে ওই হলের কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। হলের সভাপতি সাইদুজ্জামান ফারুককে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শাহবাগ থানার ওসি রেজাউল করিম জানান, ওই সংঘর্ষের পর ফারুকসহ নয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের গতকাল আদালতেও পাঠানো হয়।
লাশ দাফন: দুপুর দেড়টার দিকে ময়নাতদন্ত শেষে আবু বকরের বড় ভাই আব্বাস আলী ও মামা আজহারুল ইসলাম গ্রামের বাড়িতে তাঁর লাশ নিয়ে যান। এ এফ রহমান হলের দুজন আবাসিক শিক্ষক ও বিভাগের দুজন শিক্ষক তাঁদের সঙ্গে গেছেন।
টাঙ্গাইল থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, সন্ধ্যা ছয়টা ২০ মিনিটে আবু বকরের লাশ বাড়িতে পৌঁছায়। কয়েক গ্রামের মানুষ আগেই এসে ভিড় করেছিল আবু বকরের বাড়িতে। গোলাবাড়ী উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠে আবু বকরের জানাজা হয়। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় পারিবারিক কবরস্থানে মরদেহ দাফন করা হয়।
তথ্যসূত্র: প্রথম আলো, ৪ ফেব্রুয়ারি ২০১০