বাবর প্রধান আসামি


কর্তব্যে অবহেলাসহ হামলায় সহযোগিতা করার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হচ্ছে পুলিশের তৎকালীন আইজি, মহানগর পুলিশ কমিশনার, গোয়েন্দা পুলিশের ডিসি ও মতিঝিল জোনের ডিসিকে
মিজান মালিক
২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার পুনঃ তদন্তের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। এ মামলার বর্ধিত চার্জশিটে জোট সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরকে প্রধান আসামি করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এছাড়া পুলিশের তৎকালীন আইজি, মহানগর পুলিশ কমিশনার, ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের ডিসি ও মতিঝিল জোনের ডিসিকে কর্তব্যে অবহেলাসহ জঙ্গিদের হামলায় সহযোগিতা করার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হচ্ছে। এছাড়া ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরীকে হামলা পরিকল্পনায় সহায়তাকারী হিসেবে আসামি করা হতে পারে বলে আভাস পাওয়া গেছে। তাকে চট্টগ্রামের ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলায়ও আসামি করা হয়েছে। এর বাইরে নিষিদ্ধ ঘোষিত হরকাতুল জিহাদের আরও একাধিক শীর্ষ নেতাকে চার্জশিটভুক্ত আসামি করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে ওই তালিকার অন্যতম প্রধান এবং হরকাতুল জিহাদের প্রতিষ্ঠাতা আমীর মাওলানা আবদুস সালামকে গ্রেফতার করা হয়েছে। রিমান্ডে নিয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে সিআইডি। মাওলানা সালাম ঢাকার সিএমএম আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছেন। ৩ ডিসেম্বর তার জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। তিনি বলেছেন, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয়ের সামনে যে প্রতিবাদ সভার আয়োজন করা হয়েছিল তা পণ্ড করে দেয়াসহ দলের সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে হরকাতুল জিহাদের জঙ্গি সদস্যদের দিয়ে হামলা চালানো হয়। তৎকালীন সরকারের কিছু প্রভাবশালী মন্ত্রীর পৃষ্ঠপোষকতায় হরকাতুল জিহাদের সদস্যরা শেখ হাসিনাকে হত্যার পরিকল্পনা করে।
সূত্র জানায়, মাওলানা সালাম তার জবানবন্দিতে আরও বেশকিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ওই হামলার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনেকেই সহযোগিতা করেছেন। আবদুস সালাম পিন্টু এবং লুৎফুজ্জামান বাবর তাদের মধ্যে অন্যতম বলে সিআইডি সালামের কাছ থেকে জানতে পেরেছে। মাওলানা সালামের জবানবন্দিতে ২১ আগস্টের হামলায় জোট সরকারের গোয়েন্দা সংস্থার কোন কর্মকর্তার যোগসাজশের বিষয়টিও স্পষ্ট হয়েছে বলে সিআইডি সূত্রে জানা গেছে। এ মামলায় পাকিস্তানি নাগরিক আবদুল মজিদ বাটকেও গ্রেফতার করা হয়েছে বলে জানা গেছে। জানা গেছে, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার দিন পুলিশ বিভাগের কর্মকর্তাদের মধ্যে দায়িত্বে ছিলেন ঢাকা মহানগর পুলিশের তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কমিশনার মিজানুর রহমান, ডিবি পুলিশের উপ-কমিশনার (ডিসি) ফারুক আহমেদ ও মতিঝিল জোনের উপ-কমিশনার (ডিসি) ওবায়দুর রহমান। এদের প্রত্যেককেই আসামি করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা গেছে। এদিকে ২১ আগস্ট শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে হামলাকারী হিসেবে নোয়াখালীর জজ মিয়াকে আসামি করে তাকে দিয়ে কাল্পনিক গল্প ও এটি একটি সন্ত্রাসী হামলার কথিত কাহিনী তৈরির পেছনে যারা কাজ করেছেন তাদের মুখোশ ইতিমধ্যে উন্মোচিত হয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছে সিআইডির তৎকালীন বিশেষ পুলিশ সুপার রুহুল আমীন, তদন্ত কর্মকর্তা আবদুর রশিদ ও মুন্সী আতিকুর রহমান। মামলাটিকে ভিন্ন খাতে নেয়ার অভিযোগে ইতিমধ্যে তাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এনে মামলা হয়েছে। ওই মামলায় তাদের ৩ জনকে আসামি করে চার্জশিট দেয়া হচ্ছে। তাতে জজ মিয়াসহ ৩ যুবকের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ডকারী ২ ম্যাজিস্ট্রেট শফিক আনোয়ার ও জাহাঙ্গীর আলমকে রাজসাক্ষী করা হতে পারে বলে জানা গেছে। কেননা তারাও ওই জজ মিয়া নাটকের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন। সিআইডির এএসপি রওনাকুল হক চৌধুরী মামলার তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে ২ ম্যাজিস্ট্রেটকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন।
এদিকে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় লুৎফুজ্জামান বাবরকে আসামি করার পর সিআইডির সাবেক তিন তদন্ত কর্মকর্তার মুখোমুখি করা হয় তাকে। এসময় বাবর অসুস্থতার ভান করলেও সিআইডির একের পর এক জেরার মুখে তিনি হঠাৎ করেই নড়েচড়ে বসেন। সেই সঙ্গে তিনি পাল্টা জেরা শুরু করেন বলে সেখানে উপস্থিত একজন কর্মকর্তা জানান। তিনি জানান, বাবর সিআইডির সাবেক কর্মকর্তাকে পাল্টা প্রশ্ন করে বলেছেন, জজ মিয়াকে আসামি করার জন্য তিনি কোন নির্দেশ দিয়েছিলেন কি-না? জবাবে কর্মকর্তারা বলেছেন, এ ধরনের রাজনৈতিক স্পর্শকাতর মামলার তদন্ত করতে হলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা সরকারের ঊধর্বতন মহলের ইচ্ছার বাইরে যাওয়ার সুযোগ থাকে না।
মামলার তদন্তের অগ্রগতি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সিআইডির অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার আবদুল কাহ্হার আকন্দ জানান, আদালতের নির্দেশে তিনি মামলাটির আরও তদন্ত করছেন। তার এ তদন্তে গ্রেনেডের উৎস, এর জোগানদাতা ও হামলার নেপথ্য নায়কদের মুখোশ উন্মোচিত হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। অপর একটি সূত্র জানায়, চট্টগ্রামে যে দশ ট্রাক অস্ত্র ধরা পড়েছে সেখনে যেসব আর্জেস গ্রেনেড ছিল তা থেকে বেশকিছু গ্রেনেড ২১ আগস্টের হামলায় ব্যবহার করা হয়। সে কারণে ওই মামলার কোন কোন আসামি ২১ আগস্ট মামলার বর্ধিত চার্জশিটে আসামি হতে পারেন। এর আগে সিআইডির এএসপি ফজলুল কবির তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় মামলার তদন্ত শেষে আবদুস সালাম পিন্টু ও মুফতি হান্নানসহ যে ২২ জনকে আসামি করে চার্জশিট দিয়েছিলেন, বর্ধিত চার্জশিট থেকে তাদের কাউকে বাদ দেয়া হচ্ছে না। বরং আরও এক ডজন আসামি চার্জশিটভুক্ত হচ্ছেন। যাদের মধ্যে প্রধান আসামি হচ্ছেন লুৎফুজ্জামান বাবর। এছাড়া একজন ওয়ার্ড কমিশনারকেও আসামি করা হতে পারে।
তথ্যসূত্র: যুগান্তর, ২৬ ডিসেম্বর ২০০৯