
আখতারুজ্জামান লাবলু :
রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীসহ অধিকাংশ ভিআইপি বন্দী জেলখানায় থাকতে চাচ্ছেন না। কারাগারের বন্দী জীবনের পরিবর্তে হাসপাতালেই দিন কাটাতে চান তারা। এ লক্ষ্যে নিজেদের গুরুতর অসুস্থ প্রমাণ করার জন্য বিভিন্ন অজুহাত তৈরি করে তারা ভর্তি হচ্ছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে। তবে কারাগারের বাইরে চিকিৎসা গ্রহণের মতো গুর”তর অসুস্থ না হলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের প্রিজন সেলে ভর্তি হওয়ার সুযোগ থাকেনা। তাই নিজেদের কিভাবে গুরুতর অসুস্থ প্রমাণ করা যায় সে ব্যাপারে পরামর্শ দিয়ে কারাগারের বাইরে থেকে এসব বন্দীর কাছে চিরকুট পাঠানো হচ্ছে। আর এসব চিরকুট পাঠাচ্ছেন বন্দীদের স্বজনরাই। সূত্র মতে, এসব চিরকুটে উচ্চ আদালত থেকে জামিন লাভের স্বার্থে বন্দীদের হাসপাতালে ভর্তির মতো অসুস্থতার ভান করতে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। সম্প্রতি কারা কর্তৃপক্ষ একজন ভিআইপি বন্দীর স্ত্রীর কাছ থেকে এ ধরনের একটি চিরকুট উদ্ধারের পর তা নিয়ে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। এ ঘটনার পর চিকিৎসার জন্য বন্দীদের প্রিজন সেলে পাঠানো আপাতত বন্ধ রেখেছে কারা কর্তৃপক্ষ।
গত বুধবার ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে দেখা করতে আসা বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের মেয়র মুজিবর রহমান সারোয়ারের স্ত্রীর ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে কি ভাবে নিজেকে গুর”তর অসুস্থ প্রমাণ করা যাবে সে ধরণের পরামর্শ সংবলিত একটি চিরকুট উদ্ধার হওয়ার পর বিষয়টি প্রকাশ পায়।
সূত্র জানিয়েছে, মুজিবর রহমান সারোয়ার মানিকগঞ্জ কারাগারে বন্দী ছিলেন। কয়েকদিন আগে তাকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ফিরিয়ে আনা হয়। গত বুধবার বিকালে সারোয়ারের স্ত্রী তার সঙ্গে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে দেখা করতে আসেন। ভেতরে প্রবেশের সময় তার ভ্যানিটি ব্যাগ দেখতে চায় জেল পুলিশ। ব্যাগে পাওয়া যায় মোবাইল ফোন। জেল পুলিশের সন্দেহ হলে তারা সারোয়ারের স্ত্রীর ভ্যানিটি ব্যাগ তল্লাশি করে। তল্লাশিকালে উদ্ধার করা হয় ওই চিরকুট।
চিরকুটে লেখা রয়েছে, জেল কর্তৃপক্ষ আপনাকে ঢাকা মেডিকেল বা সোহরাওয়ার্দীতে পাঠাতে চাইবে, কোনো ক্রমেই ওখানে যাওয়া যাবে না। শুধুমাত্র পিজিতে আসতে হবে।
২ নম্বর নির্দেশনায় লেখা আছে, আপনার দিনে ৫-৬ বার বুকে ব্যথা শ্বাসকষ্ট এই মর্মে জেল ডাক্তারকে কল দিতে হবে। বাথর"মে যাওয়ার সময় অন্য লোকের সাহায্য নিতে হবে। প্রয়োজনে ২/১ বার পা ফসকে পড়তে হবে।
৩ নম্বর নির্দেশনায় লেখা রয়েছে, আপনার দুদক মামলা চেম্বার জজে বহাল আছে-(ংঃধু ্ নধরষ) ফুল বেঞ্চ এ ফিক্সড আগামী ২/১১/০৮।
উল্লেখ্য, তারেক রহমান, আরাফাত রহমান কোকো, সাবেক মন্ত্রী মোঃ নাসিম, চট্টগ্রামের মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরী, সাবেক প্রতিমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের বেশ কয়েকজন নেতা অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে সম্প্রতি জামিন পেয়ে জেল থেকে মুক্তি পেয়েছেন। অসুস্থ হলে তাড়াতাড়ি মুক্তি পাওয়া যায় এমন ধারণা এখন কারাগারে আটক ভিআইপি বন্দীদের মনে বদ্ধমূল হয়ে গেছে। এ কারণে তারা কেউ জটিল রোগে আক্রান্ত না হয়েও গুরুতর অসুস্থ হওয়ার ভান করছেন। যে কোনো উপায়ে বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রিজন সেলে অবস্থানের জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এ ব্যাপারে নেপথ্যে থেকে অজ্ঞাত ব্যক্তিরা ভিআইপি বন্দীদের পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন। ধারণা করা হচ্ছে আইনজীবী অথবা চিকিৎসকদের পরামর্শেই ভিআইপি বন্দীরা গুরুতর রোগী সাজার চেষ্টা করছেন।
একটি সূত্র জানিয়েছে, বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসকদের অনেকেই কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের সমর্থক। এ কারণে ভিআইপি বন্দীরা প্রিজন সেলে আসতে পারলে দলীয় সমর্থক চিকিৎসকদের সহযোগিতা পাবেন। তারা রোগীর শারীরিক অবস্থা গুর"তর হিসেবে উল্লেখ করে সরকারের কাছে বিদেশে উন্নত চিকিৎসার দাবি জানাতে পারবেন। ফলে তাদের মুক্তির বিষয়টি সহজ হবে।
কারা সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে কারা হাসপাতালে ২৫ জন ভিআইপি গুরুতর অসুস্থ হিসাবে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। বঙ্গবন্ধু মেডিকেলের প্রিজন সেলে ভিআইপি বন্দীদের কারণে স্থান সংকুলান না হওয়ায় সাধারণ বন্দীদের চিকিৎসার ব্যাঘাত হচ্ছে। অপরদিকে অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে ভিআইপি বন্দীরা আদালতেও হাজির হতে চান না। বারবার তারিখ বদলানোর কারণে কারা কর্তৃপক্ষকেও ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে।
তথ্য সূত্র: দৈনিক ভোরের কাগজ, ৩১ অক্টোবর ২০০৮
পোষ্ট করা হয়েছে অক্টোবর 31, 2008 তারিখে
মন্তব্য(0)