নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম
বিএনপির সাবেক সাংসদ সরওয়ার জামাল নিজামকে গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে নগরীর চিটাগাং ক্লাবের সামনে থেকে যৌথ বাহিনী গ্রেপ্তার করেছে। তাঁকে জরুরি ক্ষমতা অধ্যাদেশ-২০০৭-এর বিধিমালায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। গতকাল শুক্রবার রাতে তাঁকে ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হলে ম্যাজিস্ট্রেট আটকাদেশ দিয়ে তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
এর আগে নিরাপত্তা বাহিনীর হেফাজতে মিয়ানমারে সার পাচার, সমুদ্রে চোরাচালান, টেন্ডারবাজি, প্রশাসনে অবৈধ হস্তক্ষেপ, ১০ ট্রাক অস্ত্র খালাসে সহায়তাসহ বিভিন্ন অভিযোগে সরওয়ার জামাল নিজামকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
গ্রেপ্তার হওয়া চট্টগ্রাম-১২ (আনোয়ারা-পশ্চিম পটিয়া) আসন থেকে নির্বাচিত বিএনপিদলীয় সাবেক সাংসদ সরওয়ার জামাল নিজামের বিরুদ্ধে চট্টগ্রামের বিএনপি নেতা ও ব্যবসায়ী জামালউদ্দিন হত্যাকারীদেরও মদদ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এই মামলার একাধিক আসামি জামালউদ্দিনের হত্যার সঙ্গে তাঁর ভাই মারুফ নিজামের জড়িত থাকার কথা জানিয়েছিল।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, যৌথ বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা ও টাস্কফোর্স সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদে মিয়ানমারে সার পাচার, ১০ ট্রাক অস্ত্র খালাসে সহায়তা দেওয়া ও জামালউদ্দিন হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে কিছু জানেন না বলে দাবি করেন সরওয়ার জামাল নিজাম। দেশ-বিদেশে তাঁর স্বনামে-বেনামে বিপুল সম্পত্তি থাকার অভিযোগ রয়েছে। তবে ১৯৯৬ সালে সাংসদ নির্বাচিত হওয়ার আগে তিনি বেশির ভাগ সম্পত্তির মালিক হন বলে দাবি করেন।
যাব চট্টগ্রাম অঞ্চলের অধিনায়ক লে. কর্নেল হাসিনুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘যৌথ বাহিনী সরওয়ার জামাল নিজামকে গ্রেপ্তার করে আমাদের হাতে তুলে দিয়েছে। গ্রেপ্তারের সময় তাঁর গাড়ি থেকে মদ পাওয়া গেছে, যে কারণে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলার প্রস্তুতি চলছে। আর জামালউদ্দিন হত্যাকাণ্ড, সার পাচার, চোরাচালান, ১০ ট্রাক অস্ত্র খালাসে সহায়তা দেওয়া, টেন্ডারবাজি, প্রশাসনে অবৈধ হস্তক্ষেপ ও বিপুল সম্পদের মালিক হওয়াসহ বিভিন্ন অভিযোগের ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তারা তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে।’
জরুরি অবস্থা জারি হওয়ার পর চট্টগ্রামে বিএনপির প্রভাবশালী নেতাদের মধ্যে একমাত্র সরওয়ার জামাল নিজামই গ্রেপ্তার হলেন। অবশ্য চিকিৎসার জন্য সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এম মোরশেদ খান, সাবেক মৎস্য ও পশুসম্পদমন্ত্রী আবদুল্লাহ আল নোমান এবং সাবেক হুইপ সৈয়দ ওয়াহিদুল আলম দেশের বাইরে গিয়ে আর ফিরে আসেননি। কয়েক দিন আগেও সরওয়ার জামাল নিজামের ভাই মারুফ নিজামকে গ্রেপ্তারের জন্য অভিযান চালিয়েছিল যৌথ বাহিনী। এরপর মারুফ গা-ঢাকা দেন।
অভিযানে অংশ নেওয়া একাধিক কর্মকর্তা জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গত বৃহস্পতিবার রাতে যৌথ বাহিনীর সদস্যরা চিটাগাং ক্লাবের আশপাশে অবস্থান নেন। এ সময় সরওয়ার জামালের গাড়ির (নম্বর চট্ট-মেট্রো গ-১১-০০৫) চালক মো. মামুনুর রশীদ যৌথ বাহিনীর সদস্যদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেন। অবশ্য গাড়িটি জব্দ ও চালক মামুনকেও গ্রেপ্তার করা হয়।
যৌথ বাহিনী সূত্র জানায়, বৃহস্পতিবার রাত পৌনে একটার দিকে সরওয়ার জামাল নিজাম ক্লাব থেকে বেরিয়ে আসার সময় ধরা পড়েন। পরে তাঁর গাড়ি তল্লাশি করে মদ ও বিয়ার পাওয়া যায়।
যৌথ বাহিনী পরে তাঁর নাসিরাবাদের বাসায় রাত তিনটা পর্যন্ত ব্যাপক তল্লাশি চালায়। অবশ্য ওই বাড়িতে কিছু পাওয়া যায়নি।
জিজ্ঞাসাবাদে সরওয়ার নিজাম সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জানান, চট্টগ্রামের অভিজাত এলাকা খুলশিতে পাঁচ কাঠা, হলিক্রিসেন্ট হাসপাতালসংলগ্ন এলাকায় ১০ কাঠা, ঢাকার গুলশানে সাড়ে সাত কাঠা জমি রয়েছে তাঁর। এ ছাড়া দুটি গার্মেন্টস কারখানা, একটি সিকিউরিটি ফার্ম, গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার দুটি ট্রলার, চারটি বিলাসবহুল গাড়ি থাকার কথা স্বীকার করেন তিনি।
গোয়েন্দা ওর্ যাব সূত্র জানায়, জোট সরকারের আমলে মিয়ানমারে বেশির ভাগ সার পাচার হয়েছিল তাঁর গঠিত চোরাচালান সিন্ডিকেটের মাধ্যমে। আনোয়ারা সমুদ্র উপকূলের নিয়ন্ত্রণও ছিল তাঁর সন্ত্রাসী বাহিনীর হাতে। তাঁদের বিরুদ্ধে প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নিলে তিনি আনোয়ারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের (ওসি) বদলি করে দিতেন। তাঁর কাজে বাধা দেওয়ায় ২০০৩ সালের ১২ সেপ্টেম্বর থেকে ২০০৬ সালের ২১ আগস্ট পর্যন্ত আনোয়ারা থানার ছয়জন ওসি বদল হয়। সব ওসি একপ্রকার নাজেহাল হয়ে আনোয়ারা থানা ছাড়েন বলে অভিযোগ রয়েছে।
পুলিশ সূত্র জানায়, আনোয়ারার ডাকাতসর্দার মরতুজা আলী ও ইসলাম ডাকাত ক্রসফায়ারে নিহত হন। এতে এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিরও উন্নতি ঘটে। ক্রসফায়ারের এই ঘটনায় তৎকালীন ওসি এ কে এম মাখফারুল ইসলামকে ভর্ৎসনা করেন সাবেক সাংসদ নিজাম। তাঁর বিরোধিতার কারণে ওসি মাখফারুল পাঁচ মাসের বেশি (২০০৬ সালের ১৪ মার্চ থেকে ২১ আগস্ট) আনোয়ারায় থাকতে পারেননি। এর আগের ওসি ভুঁইয়া মাহবুব হাসান (২০০৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর থেকে ২০০৬ সালের ১৩ মার্চ) আনোয়ারায় ডাকাতবিরোধী সাঁড়াশি অভিযান শুরু করে বেকায়দায় পড়েন। তাই ওসি মাহবুবকেও বিদায় নিতে হয়েছে।
তবে গ্রেপ্তার হওয়ার পর সরওয়ার জামাল নিজাম বলেন, ‘আমাকে ঘায়েল করতেই প্রতিপক্ষরা বিভিন্ন অপপ্রচার চালাচ্ছে। আমি প্রশাসনে অবৈধ হস্তক্ষেপ করিনি। আর বিগত জোট সরকারের আমলে সাংসদ থাকাকালে গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার দুটি ট্রলারের মালিক হই আমি। এ ছাড়া ১৯৯৬ সালে প্রথমবার সাংসদ নির্বাচিত হওয়ার আগেই আমি অন্য স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির মালিক হয়েছি।’
১০ ট্রাক অস্ত্র খালাসে সহায়তার ব্যাপারে জনাব নিজাম বলেন, ‘অস্ত্র খালাসের ঘটনাটি আমি জেনেছি দুই-তিন দিন পর। কারা এসব অস্ত্র এনেছে তা আমি কী করে বলব?’ উল্লেখ্য, চট্টগ্রামের সার কারখানা ও যে ঘাটে অস্ত্র খালাস হয়েছিল, তা তাঁর নির্বাচনী এলাকার মধ্যে পড়েছে।
আমাদের আনোয়ারা প্রতিনিধি জানান, সরওয়ার নিজামের গ্রেপ্তারের খবর পেয়ে স্থানীয় লোকজন শাহ মিরপুর, শিকলবাহা বোর্ডবাজার, দারোগাহাট, জয়কালীহাট, বারশত ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম, গহিরা এবং নিহত বিএনপি নেতা জামালউদ্দিনের গ্রামের বাড়ি জিওরি হাজিরহাটে গতকাল শুক্রবার মিষ্টি বিতরণ করেন। এ সময় স্থানীয় লোকজনকে উল্লাস করতে দেখা যায়।
এদিকে সরওয়ার নিজামের গ্রেপ্তারের খবর শুনে তাঁর অনুগত আনোয়ারার সাত ইউপি চেয়ারম্যান গা-ঢাকা দিয়েছেন।
Source: http://www.prothom-alo.com/archive/news_details_home.php?dt=2007-06-23&issue_id=289&nid=Nzk3NA==