নিজামী মুজাহিদ সাঈদী ১৬ দিনের রিমান্ডে


যুগান্তর রিপোর্ট
নিজামী, মুজাহিদ ও সাঈদীকে রাজধানীর ৫টি থানায় দায়ের হওয়া পৃথক ৫ মামলায় ১৬ দিনের রিমান্ড দিয়েছেন আদালত। বুধবার অভিযুক্তদের ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে হাজির করে ওইসব থানার তদন্ত কর্মকর্তা তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য মোট ৪৭ দিনের রিমান্ডের আবেদন করলে ঢাকার বিভিন্ন মহানগর হাকিম আদালত ওই রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এছাড়া যে মামলার ওয়ারেন্ট বলে অভিযুক্তদের মঙ্গলবার গ্রেফতার করা হয়েছিল সে মামলায় আদালত নিজামী, মুজাহিদ ও সাঈদীকে জামিন দিয়েছেন। আর পল্লবী ও কেরানীগঞ্জ থানায় দায়ের হওয়া পৃথক দুটি হত্যা মামলায় নিজামী-মুজাহিদকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। এছাড়া রাজশাহীর মতিহার থানায় দায়ের হওয়া একটি হত্যা মামলায় ওই তিনজনকে এবং মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে পিরোজপুরে দায়ের হওয়া যুদ্ধাপরাধ সংক্রান্ত একটি মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। এদিকে ৫ মামলায় ১৬ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর হলেও গ্রেফতারকৃত শীর্ষ ৩ জামায়াত নেতাকে বুধবার রিমান্ডে নেয়া হয়নি। কোন মামলায় প্রথম জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে না পারায় রাত পৌনে ৮টার দিকে তাদের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠিয়ে দেয়া হয়। এর আগে বুধবার বিকালে জামায়াতে ইসলামীর ওই তিন শীর্ষ নেতাকে কঠোর পুলিশি প্রহরায় ঢাকার সিএমএম আদালতে হাজির করা হয়। জামায়াতের শীর্ষ ৩ নেতাকে হাজির করার খবরে বুধবার সকাল থেকেই ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালত এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করতে থাকে।
জামায়াত সমর্থিত আইনজীবী ও জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীরা সকাল থেকেই আদালত অঙ্গনে ভিড় করতে থাকে। এরই এক পর্যায়ে আদালত অঙ্গনে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। পুলিশ জামায়াতের নেতাকর্মীদের আদালতের বাইরে জনসন রোডে পাঠিয়ে দেয়। এরপরও তারা বিভিন্নভাবে পুলিশকে কাজে বাধা দেয়ার চেষ্টা করলে ২০ জনকে গ্রেফতার করা হয়। সংবাদকর্মীরা দিনভর আদালত অঙ্গনে অপেক্ষা করতে থাকেন। কোর্ট রিপোর্টার জানান, বিকাল সোয়া ৪টায় নিজামী, মুজাহিদ ও সাঈদীকে কড়া পুলিশি প্রহরায় প্রিজন ভ্যানে করে আদালতে আনা হয়। এর পরই তাদের অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর হাকিম মোহাম্মদ আলী হোসাইনের আদালতে নেয়া হয়। সেখানে পল্টন থানায় পুলিশের কর্তব্য কাজে বাধা দেয়ার অভিযোগে ফেব্রুয়ারি এবং জুন মাসে দায়ের হওয়া পৃথক তিন মামলায় নিজামী-মুজাহিদ-সাঈদীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১০ দিন করে মোট ৩০ দিনের রিমান্ডের আবেদন করেন পল্টন থানার সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তারা। অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর হাকিম মোহাম্মদ আলী হোসাইনের আদালতে এসময় জামায়াতের আইনজীবীরা ছাড়াও ঢাকা আইনজীবী সমিতির সভাপতি সানাউল্লাহ মিয়া অভিযুক্তদের রিমান্ড বাতিল করে জামিন চান। জামায়াতের পক্ষে শুনানিতে অংশ নেন মশিউল আলম, আবদুর রাজ্জাক, আশরাফুল ইসলাম, আক্তারুজ্জামান সোহেল প্রমুখ আইনজীবী। তারা আদালতকে বলেন, অভিযুক্তরা এসব মামলার ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন। এজাহারে তাদের নামও নেই। রাজনৈতিকভাবে হয়রানি করার জন্য তাদের একটি জামিনযোগ্য মামলায় গ্রেফতার করে বিভিন্ন মামলায় গ্রেফতার দেখানো হচ্ছে এবং রিমান্ড চাওয়া হচ্ছে। আদালতে এসময় রাষ্ট্রপক্ষে মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর মোঃ আবদুল্লাহ আবু, জেলা পাবলিক প্রসিকিউটর খন্দকার আঃ মান্নান, মোখলেসুর রহমান বাদল, আবদুর রহমান হাওলাদার প্রমুখ আইনজীবী অভিযুক্তদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের সপক্ষে বক্তব্য রাখেন। তারা বলেন, অভিযুক্তদের নির্দেশে রাষ্ট্রপতির যাতায়াতের পথে কর্তব্যরত পুলিশের কাজেও কর্মীরা বাধা সৃষ্টি করেছে। এসময় শুনানি শেষে হাকিম মোহাম্মদ আলী হোসাইন প্রত্যেকটি মামলায় নিজামী-মুজাহিদ-সাঈদীকে তিন দিন করে মোট ১২ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। তবে একটি মামলায় রিমান্ডের পর আরেকটি মামলার রিমান্ড কার্যকর হবে বলে হাকিম তার আদেশে উল্লেখ করেন।
এরপর একই আদালতে উত্তরা থানায় গত মার্চ মাসে দায়ের হওয়া রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় তদন্ত কর্মকর্তা অভিযুক্তদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১০ দিনের রিমান্ডের আবেদন করেন। রাষ্ট্রদ্রোহ মামলার বাদী উত্তরা থানার এসআই সেলিম হোসেন রিমান্ড আবেদনে আদালতকে জানান, গ্রেফতারকৃত জামায়াতে ইসলামীর আমীর মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ, নায়েবে আমীর মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি উত্তরার ১৪ নম্বর সেক্টরের ১৮ নম্বর সড়কে ৪৫ নম্বর বাসায় বসে রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করাসহ দেশে বিশৃংখলা সৃষ্টি এবং নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে দেশের গণতন্ত্রকে নস্যাৎ করার ষড়যন্ত্র করেন। তাদের কর্মীদের তারা এ ব্যাপারে পরামর্শ ও নির্দেশনা দেন। পরিকল্পিতভাবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার বিঘ্ন ঘটানোর চেষ্টা করে। রিমান্ড আবেদনে জানানো হয়, এর আগে গ্রেফতারকৃত আসামিরা চলতি বছরের ৭ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী সফরকালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিবির কর্মীদের নিয়ে একটি গোপন বৈঠক করেন। ওই বৈঠকে আধিপত্য বজায় রাখতে বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলা চালানোর সময় সর্ব্তাক সহায়তা প্রদানের আশ্বাস দেয়া হয়। এর এক দিন পরই ৮ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সহিংস ঘটনা ঘটে। তাদের নির্দেশে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এসএম হলে শিবির ক্যাডাররা ছাত্রলীগ কর্মীদের ওপর হামলা চালায়। এসময় তারা ছাত্রলীগ কর্মী ফারুককে নৃশংসভাবে হত্যা করে লাশ ম্যানহোলে ফেলে দেয়। চাঞ্চল্যকর ওই মামলায় ইতিমধ্যেই গ্রেফতারকৃত এজাহারনামীয় আসামিরা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। আবেদনে বলা হয়, উত্তরার ১৪ নম্বর সেক্টরের ১৮ নম্বর রোডের ৪৫ নম্বর বাসায় অভিযুক্তদের নির্দেশে অন্য আসামিরা রাষ্ট্রবিরোধী বৈঠকে বসে ষড়যন্ত্র করে। তাই ওই বৈঠকের কারণ ও সহযোগীদের বিষয়ে জানার জন্য তাদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন। হাকিম ইসমাইল হোসেন উভয় পক্ষের শুনানি শেষে ৩ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এরপর একই এজলাসে বসেন হাকিম এসকে তোফায়েল হাসান। সেখানে প্রথম ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার ঘটনায় তরিকত ফেডারেশন সভাপতি রেজাউল ইসলাম চাঁদপুরীর মামলায় আইনজীবীরা অভিযুক্তদের জন্য জামিন চান। তারা বলেন, মামলার ধারাগুলো যেহেতু জামিনযোগ্য তাই অভিযুক্তরা জামিন পেতে হকদার। হাকিম আবেদন মঞ্জুর করে তাদের ৫০ হাজার টাকার মুচলেকায় জামিন দেন। একই হাকিমের কাছে গত রোববার হরতালের আগের রাতে রমনা এলাকায় গাড়ি ভাংচুর ও পোড়ানোর ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় অভিযুক্তদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৭ দিনের রিমান্ডের আবেদন করা হয়। আদালত উভয় পক্ষের শুনানি শেষে ৪ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এদিকে আদালতে শুনানির সময় বারবার রাষ্ট্রপক্ষ ও অভিযুক্তদের আইনজীবীরা বিবাদে জড়িয়ে পড়েন এবং হট্টগোলের সৃষ্টি হয়।
লোহার খাঁচায় নিজামী-মুজাহিদ-সাঈদী : নিজামী-মুজাহিদ-সাঈদীকে অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর হাকিম মোহাম্মদ আলী হোসাইনের এজলাসের পাশে লোহার খাঁচায় এনে রাখা হয়। আদালতে শুনানির প্রায় দেড়ঘন্টা তারা সেখানে দাঁড়িয়ে থেকে আইনজীবীদের বক্তব্য শোনেন। সন্ধ্যা ৬টা ১০ মিনিটে শুনানি শেষে তাদের কোর্ট হাজতখানায় নিয়ে রাখা হয়। কোন মামলার রিমান্ডে প্রথম জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে সে সিদ্ধান্ত নিতে না পারায় রাত পৌনে ৮টার দিকে তাদের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়।
তথ্যসূত্র: যুগান্তর, ১ জুলাই ২০১০
মন্তব্য(0)




