জলাশয় ভরাট করে আবাসিক প্রকল্প রাজউক কি সব আইন কানুনের উর্ধ্বে
কেরানীগঞ্জের এ এলাকাটি এক সময় জলাবদ্ধ ছিল। সেখানে ঝিলমিল প্রকল্পের জন্য মাটি ভরাট করা হয়েছে । সমকাল
অমিতোষ পাল
যত দোষ বেসরকারি হাউজিং এস্টেটগুলোর। পান থেকে চুন খসলেই তাদের রেহাই নেই। অথচ ধোয়া তুলসীপাতা যেন রাজউক। তাদের সব দোষই মাফ। জলাশয় ভরাট করে আবাসিক প্রকল্প বাস্তবায়ন করলে তাদের আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়। এদিকে রাজউক নিজেই যে জলাশয় ভরাট করে আবাসিক প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে, সেদিকে কারও নজর নেই। রাজউকের বাস্তবায়নাধীন বেশিরভাগ প্রকল্পের জন্য নিচু ও কৃষি জমি ভরাট, বসতভিটা উচ্ছেদ ও গাছপালা কেটে সাবাড় করা হচ্ছে। জলাধার সংরক্ষণ আইন মানা হচ্ছে না। রক্ষক হয়ে ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে রাজউক। সরেজমিন ঘুরে এসব চিত্র চোখে পড়েছে। অবশ্য রাজউক বলেছে, জলাশয় নয়, কিছু নিচু জমি ভরাট করা হয়েছে। ভালো কিছু করতে হলে সামান্য ছাড় দিতেই হয়। প্রশ্ন উঠেছে, সামান্য এই ছাড় শুধু রাজউকের জন্য কেন?
জানা গেছে, ১৯৯১ সালে রাজধানীর অদূরে পরিকল্পিত আবাসিক কাম দাফতরিক উপশহর গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয় রাজউক। সে অনুযায়ী নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর অংশে ১ হাজার ৫০০ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। এখানে ৩০ হাজার প্লট তৈরির
পরিকল্পনা আছে। ইতিমধ্যে কয়েক দফায় প্রায় ১৫ হাজার প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আগামী আগস্ট মাসে আরও ৬ হাজার প্লট বরাদ্দ দেওয়া হতে পারে। এই বিশাল এলাকায় এক দশক আগে জলাশয় ছাড়া আর কিছু চোখে পড়ত না। গত কয়েক বছর ধরে ওই জলাশয় দেদার ভরাট করা হয়েছে। এছাড়া গাছপালাগুলো কেটে সাবাড় করা হয়েছে। পুরনো বসতিদের উচ্ছেদ করা হয়েছে। পুরো এলাকায় এখন বালুমাটি ছাড়া আর কিছু চোখে পড়ে না।
রাজউক সূত্র জানিয়েছে, পূর্বাচল আবাসিক প্রকল্পের ৪০ শতাংশ জায়গা ইতিমধ্যে ভরাট করে ফেলা হয়েছে। ২০ শতাংশ রাস্তার কাজ হয়েছে। ব্রিজ, লিংক রোডের কাজ শুরু হয়েছে। ফ্লাইওভারের জন্য ঠিকাদার খোঁজা হচ্ছে। বর্তমানে দেখে বোঝার উপায় নেই, কয়েক বছর আগেও এখানে বিশাল জলাশয় ছিল।
পূর্বাচল প্রকল্পের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত কামাল হোসেন সমকালের কাছে অভিযোগ করেন, পূর্বাচল প্রকল্পে কিছু বাড়ি ছাড়া আর কিছুই ছিল না। অন্যান্য অংশে সারা বছর পানি থাকত। সেখানে আমন ধান হতো। এসব জায়গা ভরাট করে প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আরও বিস্ময়কর হলো, যাদের জমি অধিগ্রহণ করে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, সেই ক্ষতিগ্রস্তরা প্লট পাননি। অবশ্য পূর্বাচল প্রকল্পের পরিচালক এবিএম রফিকুল ইসলাম খান সমকালকে বলেন, এখানে জলাশয় নয়, কিছু নিচু জায়গা ছিল। আর নিচু জায়গায় পানি জমে থাকবে_ এটাই স্বাভাবিক। তবে ক্ষতিগ্রস্তরা এবার প্লট পাবেন। তাদের জন্য ১ হাজার প্লট সংরক্ষিত আছে বলে তিনি জানান।
রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব), প্ল্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন, পরিবেশবাদী সংগঠনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অভিযোগ, রাজউক নিজেই পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অমান্য করে রাজধানীর চারপাশে আবাসিক প্রকল্পের নামে পরিবেশ বিপর্যয় ডেকে আনছে। পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্প, উত্তরা সম্প্রসারিত আবাসিক প্রকল্প (তৃতীয় পর্ব), কেরানীগঞ্জের ঝিলমিল আবাসিক প্রকল্প, নিকুঞ্জ, বারিধারা ও বাড্ডা পুনর্বাসন প্রকল্পের জন্য এ পর্যন্ত সাড়ে ৮ হাজার একর জমি ভরাট করা হয়েছে। এসব স্থানে ছিল নিচু জমি, জলাশয়, খাল-বিল, পুকুর, ফসলি জমি, ফ্লাড ফ্লোর জোন বা বন্যাপ্রবাহ এলাকা। এসব জমির কিছু স্থানে ছিল হাজার হাজার গাছপালা ও সৌন্দর্য বর্ধনকারী টিলা। আবাসিক এলাকা তৈরির নামে হাজার হাজার মানুষকে এসব জায়গা থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্তরা অধিগ্রহণকৃত জমির ন্যায্যমূল্য পাননি। বরং অনাচারের প্রতিবাদকারীরা রাজউকের প্রতিহিংসার শিকার হয়েছেন। কোনো প্রকল্পেরই সফল সমাপ্তি ঘটেনি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে রাজউকের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, পরিকল্পিত আবাসিক এলাকার নামে এসব এলাকায় কার্যত উন্নতমানের বস্তি গড়ে তোলা হচ্ছে। তারা বলেন, রাজনৈতিক সরকারগুলো তাদের অনুগত ব্যক্তির নামে প্লট বরাদ্দ দেয়। সেই প্লটও শেষ পর্যন্ত বরাদ্দপ্রাপ্তরা রাখেন না। বিত্তশালীদের কাছে বিক্রি করে দেন। তারা ইচ্ছেমতো বাণিজ্যিক ভবন গড়ে তোলেন। বিগত সরকারের আমলে বারিধারায় কূটনৈতিক পল্লীতে লেকের পাশেই একটি শিল্প সংগঠনকে প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু কূটনীতিকরা সেখানে শিল্প কারখানা স্থাপনে আপত্তি তোলেন। সম্প্রতি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ দিলে মন্ত্রণালয় ওই শিল্প সংগঠনকে অন্যত্র প্লট দেওয়ার সুপারিশ করেছে। এভাবে গুলশান লেকের পাড়েও লেক ভরাট করে একাধিক প্লট বরাদ্দ দেওয়ার নজির সৃষ্টি করেছে। এমনকি রাজউকের এক সাবেক চেয়ারম্যানও লেক ভরাট করে প্লট বরাদ্দ নিয়েছেন। এছাড়া একজন সাবেক মন্ত্রী, একটি সরকারি সংস্থার সাবেক প্রধান প্রকৌশলী, একজন মেয়র, একজন পরিবেশবাদীকেও গুলশান লেক ভরাট করে প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বিগত সরকারের আমলে পূর্তমন্ত্রী মির্জা আব্বাস ও তৎকালীন চেয়ারম্যান শহীদ আলমের নেতৃত্বে এসব অনাচার হয়েছে সবচেয়ে বেশি।
রাজউকের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী এমদাদুল ইসলাম সমকালকে বলেন, রাজউকের প্লট বরাদ্দ প্রক্রিয়া মানেই দুর্নীতি। এটার অবসান হওয়া দরকার। বলা হচ্ছে, রাজধানীবাসীর বাসস্থানের সংস্থান ও পরিকল্পিত আবাসিক এলাকা গড়ে তোলার জন্য এটা করা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে এটা কাজেই আসছে না। কারণ হিসেবে রাজউকের একাধিক কর্মকর্তা এ প্রতিবেদককে বলেন, বর্তমানে কমবেশি ৮ হাজার ব্যক্তিকে প্লট বরাদ্দের প্রক্রিয়া চলছে। কিন্তু এসব প্লটে ১ লাখ ৬০ হাজার ফ্ল্যাট তৈরি করা সম্ভব। রাজউক নিজ উদ্যোগে গ্রাহকের কাছ থেকে অগ্রিম টাকা নিয়ে ফ্ল্যাট তৈরি করতে পারে। এতে সমসংখ্যক পরিবারের বাসস্থানের ব্যবস্থা করা যায়। এভাবে পরিকল্পিত আবাসিক এলাকা গড়ে তোলাও সম্ভব। অন্যথায় প্লট বরাদ্দ দিয়ে কেবল জলাশয় ভরাট হবে ও কিছু লোক সুবিধাভোগী হবে। কিন্তু নগরবাসীর বাসস্থানের সংকুলান হবে না।
সরেজমিন কেরানীগঞ্জের ঝিলমিল প্রকল্প এলাকায় দেখা যায়, বিস্তীর্ণ নিচু এলাকাকে বালু দিয়ে ভরাট করা হয়েছে। কেরানীগঞ্জের ঢাকা-মাওয়া সড়কের সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে প্রকল্প এলাকায় তাকালে দেখা যায়, কেবলই ধু ধু বালুরাশি। বালুর ওপর দিয়ে কিছু পাইপ টেনে নেওয়া হয়েছে। দু‘এক স্থানে গজিয়ে উঠেছে ঘাস ও ছোট গাছপালা। এর মাঝ দিয়ে চলে গেছে বিদ্যুতের ভারি লাইন। স্থানীয়রা জানান, ঝিলমিল প্রকল্প তৈরির ক্ষেত্রেও চলেছে জলাশয় ভরাট ও দেদার বৃক্ষকর্তন। রাজউক জানিয়েছে, পূর্বাচল ও উত্তরার প্লট বরাদ্দ কার্যক্রম শেষ হলে ঝিলমিল প্রকল্পেও প্লট বরাদ্দ দেওয়া হবে।
তথ্যসূত্র:http://www.samakal.com.bd/details.php?news=13&action=main&option=single&news_id=4630&pub_no=49
মন্তব্য(0)