মিজান মালিক
রাষ্ট্রপতির কাছে জমা দেয়া বার্ষিক প্রতিবেদনে দুদকের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও লেনদেনের বিষয়ে তথ্য গোপন করা হয়েছে। প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, দুদক দু’বছরে বিভিন্ন দাতা দেশ ও সংস্থার কাছ থেকে কি পরিমাণ অর্থ নিয়েছে তার কোন হিসাব তাতে উল্লেখ করা হয়নি। শুধু তাই নয়, দুর্নীতি প্রতিরোধ ও দমনের নামে অর্থ খরচ, আইনজীবীদের বেতন-ভাতা, সোর্সমানির অর্থ খরচ, দুদকের নতুন ভবন নির্মাণ, দাফতরিক সংস্কার কাজ, কেনাকাটা, টেন্ডারসহ অন্যান্য খাতে খরচেরও কোন হিসাব রাষ্ট্রপতিকে প্রতিবেদনের মাধ্যমে জানানো হয়নি। দুদকের বার্ষিক প্রতিবেদনে তথ্য গোপনের বিষয়ে নতুন চেয়ারম্যান গোলাম রহমানের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি রোববার যুগান্তরকে বলেন, আমি অতীতের কোন ভুলের পুনরাবৃত্তি করতে চাই না। আমি মনে করি, দুদকের কাজে স্বচ্ছতা থাকা দরকার। যাতে দেশের মানুষ দুদকের কাজে সন্তোষ প্রকাশ করে। গোলাম রহমান জানান, তিনি নিজেও রাষ্ট্রপতিকে দেয়া বার্ষিক প্রতিবেদনটি পড়েছেন। তাতে দেখা যায়, সেখানে দুদকের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের তেমন বিবরণ নেই। দুদকের সাবেক কমিশনার প্রফেসর এম মনিরুজ্জামান মিঞা এ প্রসঙ্গে যুগান্তরকে বলেন, দুদক কি পরিমাণ বিদেশী সাহায্য নিয়েছে তা রাষ্ট্রপতিকে জানানো বাধ্যতামূলক। দুদক যদি এ বিষয়ে রাষ্ট্রপতিকে কিছু না জানিয়ে থাকে তাহলে বলতে হবে, মহাজালিয়াতি করা হয়েছে।
মনিরুজ্জামান মিঞা দুদক কর্মকর্তাদের প্রসঙ্গে বলেন, দেশ থেকে দুর্নীতি নির্মূলের আগে নিজেদের স্বচ্ছ করতে হবে। তারা ৫০ কোটি টাকা অনুদান এনেছে নাকি ১০০ কোটি টাকা এনেছে তা কেন রাষ্ট্রপতিকে জানানো হবে না? এছাড়া প্রাপ্ত অর্থের খরচ কোন খাতে হয়েছে তাও জানাতে হবে। তিনি আরও মনে করেন, দুদক যদি তাদের আর্থিক হিসাব রাষ্ট্রপতিকে না জানিয়ে থাকে তাহলে রাষ্ট্রপতি ওই প্রতিবেদনটি জাতীয় সংসদে পাঠিয়ে এ বিষয়ে তদন্তের ব্যবস্থা করতে পারেন।
এ বিষয়ে টিআইবির সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ বলেন, দুদকের সব কাজই ট্রান্সপারেন্ট হওয়া উচিত। যাতে কেউ সন্দেহ পোষণ করতে না পারে। তিনি বলেন, দুদক কর্মকর্তাদের সব ধরনের বিতর্ক, অনিয়ম এবং দুর্নীতির ঊর্ধ্বে থাকতে হবে।
২০০৪ সালের দুদক আইনের ২৯(১) ধারা অনুযায়ী দুদক প্রতি বছর মার্চের মধ্যে পূর্ববর্তী বছরের যাবতীয় কার্যক্রমের বিষয়ে রাষ্ট্রপতিকে প্রতিবেদন দেবে। এটা বাধ্যতামূলক। কিন্তু ২০০৪ সালের ২১ নভেম্বর যাত্রা শুরু হওয়া স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন গত সাড়ে চার বছরের মধ্যে মাত্র এক বছরের প্রতিবেদন দিয়েছে। তাও অসম্পূর্ণ। আর্থিক বিষয়ে তথ্য গোপন করা হয়েছে তাতে।
লে. জেনারেল (অব.) হাসান মশহুদ চৌধুরী ২০০৭ সালের ২৫ ফেব্র“য়ারি পুনর্গঠিত দুদকের চেয়ারম্যান নিযুক্ত হওয়ার পর রাষ্ট্রপতিকে বার্ষিক প্রতিবেদন দেয়ার জন্য উদ্যোগ নেন বলে জানা যায়।
তিনি দুদক থেকে পদত্যাগের কয়েক মাস আগে তার কর্মকাণ্ডের এক বছরের (ফেব্র“য়ারি ২০০৭ থেকে মার্চ ২০০৮ পর্যন্ত) প্রতিবেদন তৈরি করে তা রাষ্ট্রপতির দফতরে পাঠিয়ে দেন। তাতে মোট ১৬টি অধ্যায় সন্নিবেশন করা হয়। জরুরি বিধিমালায় দুদকের মামলায় বিশেষ আদালতে দুদকের মামলার বিচার, সম্পদের নোটিশ প্রদান, দুর্নীতির অনুসন্ধান ও তদন্ত এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি প্রতিরোধে কার্যক্রম গ্রহণসহ আনুষঙ্গিক বিষয়ে প্রতিবেদনে তথ্য দেয়া হয়। কিন্তু কি পরিমাণ বিদেশী সাহায্য কিভাবে পাওয়া গেছে, কিভাবে কোন খাতে কত খরচ হয়েছেÑ এর ছিটেফোঁটা বর্ণনাও নেই কোন অধ্যায়ে।
প্রতিবেদনের ১৫তম অধ্যায়ে ‘উন্নয়ন অংশীদারদের কাছ থেকে সমর্থন’ শিরোনামে প্রকাশিত পর্বে কাদের কাছ থেকে সমর্থন পাওয়া গেছে কেবল সে বিষয়ে কয়েকটি লাইন সংযোগ করা হয়। তাতে বলা হয়Ñ ইউএনডিপি, অস্ট্রেলীয় হাইকমিশন, এডিবি, ড্যানিডা ও ডিএফআইডির কাছ থেকে সমর্থন পাওয়া গেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি ইউএনডিপি সর্বদাই দুদকের ঘোরতর সমর্থক। দুদক কর্মসূচির কার্যকারিতার ওপর সমীক্ষা চালিয়ে তারা দুদককে সাহায্য করেছেন। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক এডিবি তার সুশাসন প্রকল্পের অংশ হিসেবে দুদককে সহায়তা দিচ্ছে। ড্যানিডা এডিবির মাধ্যমে দুদকের দুর্নীতিবিরোধী গণসচেতনতা সৃষ্টির কর্মসূচিকে সহায়তা দিয়ে চলেছে। এক্ষেত্রে তারা মোবাইল সিনেমা ইউনিট ক্রয়েরও প্রস্তাব দিয়েছে। ডিএফআইডির অর্থ সহায়তায় দুদক সদর দফতরের আধুনিকায়ন করা হয়েছে। প্রতিটি ফ্লোরে স্থাপন করা হয়েছে অত্যাধুনিক ওয়ার্ক স্টেশন।
প্রতিবেদনে অবশ্য ১৪টি কম্পিউটার প্রাপ্তির একটা ছোট অনুদানের তথ্য দেয়া হয়েছে। তাতে বলা হয়, দুদক কার্যক্রমের প্রতি সমর্থনের অংশ হিসেবে অস্ট্রেলীয় হাইকমিশন ১৪টি কম্পিউটার উপহার দিয়েছে।
এদিকে দুদককে কার্যকর ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সুপারিশ প্রণয়নের জন্য প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে গঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি সরকারকে না জানিয়ে দুদকের বিদেশী সাহায্য গ্রহণের বিষয়ে তীব্র সমালোচনা করেছে। কমিটির সুপারিশে বলা হয়েছে, দুদকের আর্থিক বিষয়ে স্বচ্ছতা নেই। তারা সরকারকে পাশ কাটিয়ে বিদেশী সাহায্য নিয়েছে। ভবিষ্যতে দুদক এ প্রক্রিয়ায় কোন দাতা দেশ বা সংস্থার কাছ থেকে অর্থ নিতে হলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে তা জানাতে হবে।
দুদকের দু’বছরের কর্মকাণ্ড তদন্তের জন্য গঠিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর দুদকের বার্ষিক প্রতিবেদনের বিষয়ে যুগান্তরকে বলেন, তারা (দুদক) নিজেরাই এখন তথ্য গোপনের দায়ে অভিযুক্ত। তারা দু’বছরে দুদক কার্যক্রমকে নিজেদের পৈতৃক সম্পদ মনে করে ব্যবহার করেছেন। কারও কাছে জবাবদিহিতা না থাকায় দুদকের বড় কর্মকর্তারা বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। তাদের কাজের হিসাব নিয়ে টান দিলে সব দুর্নীতি বেরিয়ে আসবে।
দুদকের পদত্যাগকারী চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনারকে সংসদীয় কমিটির সামনে তলব করা হলে তারা রাষ্ট্রপতির কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য এবং সংসদে যেতে বাধ্য নন বলে জানিয়ে দেন।
দুদক আইন অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির কাছে জবাবদিহির অংশ হিসেবেই তাদের যাবতীয় কর্মকাণ্ডের বার্ষিক প্রতিবেদন দাখিল করতে হয়। অথচ সেখানে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ছাড়া আরও গুরুত্বপূর্ণ অনেক বিষয় এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। দুদক দু’বছরে গুরুতর অপরাধ দমন অভিযান সংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটি (এনসিসি) ও দুর্নীতির অনুসন্ধান তদন্তের জন্য গঠিত টাস্কফোর্সের কর্মকাণ্ডের বিষয়ে তেমন কোন তথ্য দেয়া হয়নি। কার নির্দেশে, কোথা থেকে কিভাবে সন্দেহভাজন দুর্নীতিবাজদের তালিকা হতো, হাসান মশহুদ চৌধুরী যোগদানের আগে কার নির্দেশে দেশের বিশিষ্ট ৫০ ব্যক্তিকে দুর্নীতিবাজ আখ্যা দিয়ে তাদের সম্পদের হিসাব চেয়ে নোটিশ দেয়া হয়। এ বিষয়টিও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি। দুর্নীতির মামলা পরিচালনার জন্য কতজন আইনজীবী নিয়োগ দেয়া হয়েছে, তারা কারাÑ তাদের কোন তালিকা দেয়া হয়নি। তাদের কাকে কোন কারণে কত দিতে হয়েছে সে বিষয়েও প্রতিবেদনে কিছু বলা হয়নি।
এদিকে রাষ্ট্রপতিকে দেয়া বার্ষিক প্রতিবেদনের একটি কপি সরকারি প্রতিষ্ঠান সংক্রান্ত জাতীয় সংসদের স্থায়ী কমিটির সদস্যরা পেয়েছেন বলে জানা গেছে। সূত্র জানায়, তারা প্রতিবেদনটি পর্যালোচনা করে তাতে কি কি তথ্য গোপন করা হয়েছে সে বিষয়ে একটি খসড়া প্রতিবেদন তৈরির কাজ করছেন। কমিটি চলতি মাসেই দুদকের পদত্যাগকারী চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনারকে দুদকের কর্মকাণ্ডের বিষয়ে জবাবদিহি করার জন্য তৃতীয় দফায় নোটিশ দিতে যাচ্ছে। কমিটির সভাপতি বলেন, তাদের আসতেই হবে। সংসদের সামনে হাজির না হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে তাদের বিরুদ্ধে। তিনি বলেন, দুদকের শীর্ষ কর্মকর্তাদের আÍপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতেই তাদের বারবার হাজির হওয়ার জন্য নোটিশ দেয়া হচ্ছে।
তথ্যসূত্র: http://www.jugantor.info/enews/issue/2009/07/06/news0270.php