
নিজস্ব বার্তা পরিবেশক ।।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর নামে সিঙ্গাপুরে ব্যাংকে রাখা প্রায় ১২ কোটি টাকা জব্দ করা হয়েছে। এ অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। গতকাল বৃহস্পতিবার নিয়মিত প্রেস ব্রিফিংয়ে দুদকের মহাপরিচালক (প্রশাসন) কর্নেল হানিফ ইকবাল এসব তথ্য জানান।
ব্রিফিংয়ে হানিফ ইকবাল জানান, সিঙ্গাপুর ক্রেডিট ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইটি কমার্শিয়াল ব্যাংকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর গচ্ছিত ১১ কোটি ৯১ লাখ ৫৬ হাজার ৯৪৭ টাকার অর্থ জব্দ করেছে সিঙ্গাপুর কর্তৃপক্ষ। এ ব্যাংকে কোকোর লেনদেনের বিশদ বিবরণসহ সিঙ্গাপুর কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে বেশ কিছু প্রমাণভিত্তিক তথ্য পেয়েছে দুদক। পুরো বিষয়টি অনুসন্ধান এবং আইনি কার্যক্রম গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুদক। এ ব্যাপারে একজন কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়েছে। কর্নেল হানিফ ইকবাল জানান, অবৈধ ও দুর্নীতির মাধ্যমে উপার্জিত অর্থ এবং সম্পদ সম্পর্কে আন্তঃরাষ্ট্রীয় তথ্যবিনিময় এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের চিহ্নিতকরণ এবং আইনি প্রক্রিয়া সংক্রান্ত ‘ইউনাইটেড ন্যাশনস কনভেনশন এগেইনস্ট করাপশন’-এর আওতায় বাংলাদেশ থেকে ‘মিউচ্যুয়াল লিগ্যাল এসিসট্যান্ট রিকোয়েস্ট’-এ সিঙ্গাপুর সরকারের এটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের মাধ্যমে এ তথ্য পাওয়া যায়।
ওই তথ্য অনুযায়ী জানা যায়, কোকো তার কয়েকজন সহযোগী এবং সিঙ্গাপুরের একজন এজেন্টের মাধ্যমে ২০০৪ সালের ১০ এপ্রিল ‘জাস’ নামে একটি কোম্পানি চালু করেন। বাংলাদেশে ব্যবসায়িক স্বার্থ আছে এমন একটি কোম্পানি চায়না হার্বার ইঞ্জিনিয়ারিং নামে একটি প্রতিষ্ঠান থেকে ২০০৫ সালের ৬ মে ৯ লাখ ২০ হাজার ৯৮৬ সিঙ্গাপুর ডলার এবং একই বছরের ৩১ মে ৮ লাখ ৩০ হাজার ৬৫৬ সিঙ্গাপুর ডলার ‘জাজ’ কোম্পানির একাউন্টে নেয়া হয়।
একই বছরের ২৯ জুলাই ‘জাস’ কোম্পানির ওই একাউন্ট থেকে কোকোর সইকৃত চেকের মাধ্যমে ৮ লাখ ৩০ হাজার ৬৫৬ ডলার অন্যত্র স্থানান্তর করা হয়। ওই বছরের ১ আগস্ট চায়না হার্বার ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি থেকে ৮ লাখ ২৯ হাজার ৭০৬ সিঙ্গাপুর ডলার ‘জাস’ কোম্পানির একাউন্টে নেয়া হয়। একইভাবে ওই বছরের ৬ অক্টোবর ৩ লাখ ৩ হাজার ২৫৪ সিঙ্গাপুর ডলার ‘জাস’ কোম্পানির একাউন্টে জমা হয়। ২০০৭ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি সিঙ্গাপুর ক্রেডিট ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইটি কমার্শিয়াল ব্যাংকে সিঙ্গাপুরের এজেন্টের মাধ্যমে ২০ লাখ ১৩ হাজার ৪৬৭ সিঙ্গাপুর ডলার ‘জাস’ কোম্পানির একাউন্টে স্থানান্তর করেন আরাফাত রহমান কোকো।
কর্নেল হানিফ জানান, বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধে কোকোর ওই ব্যাংকে জমা থাকা ২০ লাখ ৬১ হাজার ৯৩ সিঙ্গাপুর ডলার এবং দুই লাখ ৬১ হাজার ৪৭৭ মার্কিন ডলার সাময়িকভাবে জব্দ করেছে সিঙ্গাপুর সরকার। পরে এসব বাংলাদেশকে অবহিত করা হয়।
আরাফাত রহমান কোকো এখন উন্নত চিকিৎসার জন্য ব্যাংককে অবস্থান করছেন। তিনি দুটি মামলার আসামি হিসেবে প্রায় ১০ মাস জেল খাটার পর প্যারোলে মুক্তি পেয়ে ব্যাংকক যান। আরাফাত রহমান কোকোকে ২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর সকালে গ্যাটকো দুর্নীতি মামলার অভিযুক্ত আসামি হিসেবে তার মা খালেদা জিয়ার সঙ্গে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের পর আদালতের মাধ্যমে কোকোকে ৭ দিনের পুলিশ রিমান্ডে নেয়া হয়। ৭ দিন পুলিশ রিমান্ডে রাখার পর তাকে জেল হাজতে পাঠানো হয়। কোকোর মুক্তির শর্তগুলো হলো ‘তিনি সর্বোচ্চ ২ মাসের জন্য এ সুযোগ পাবেন, বিদেশে চিকিৎসার জন্য গমন করলে তিনি বা তার নিকটাত্মীয় ৩ দিন পরপর সেখানকার বাংলাদেশ মিশনকে তার স্বাস্থ্যের অবস্থা জানাবেন, তিনি কোন রাজনৈতিক, ব্যবসায়িক বা অন্য কোন কর্মকাণ্ডে জড়িত হতে পারবেন না, স্বাস্থ্যগত বিষয় ছাড়া অন্য কোন কারণে কোন সংস্থা বা ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবেন না, সাময়িক মুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে চিকিৎসা শেষ হলে সরকারকে তা অবহিত করতে এবং দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করতে হবে, কোন শর্ত ভঙ্গ হলে সাময়িক মুক্তিদানের সিদ্ধান্ত বাতিল করা হবে এবং সরকার কোন কারণ দর্শানো ছাড়া যে কোন সময় সাময়িক মুক্তিদানের এ সিদ্ধান্ত বাতিল করতে পারবে।
প্রজ্ঞাপনে তাকে ১৭ জুলাই থেকে ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মুক্তি দেয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। পরে একাধিকবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে কোকোর জামিনের মেয়াদ বাড়িয়ে দেয়।
২০০৭ সালের ২ সেপ্টেম্বর সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ ১৩ জনকে অভিযুক্ত করে দুর্নীতি দমন কমিশন রাজধানীর তেজগাঁও থানায় গ্যাটকো দুর্নীতি মামলা দায়ের করে। পরে এ মামলায় সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আরও ১১ জনকে অভিযুক্ত করা হয়। গ্যাটকো দুর্নীতি মাধ্যমে রাষ্ট্রের প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা ক্ষতি করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। প্রাথমিকভাবে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় গত ৮ মে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের প্রভাবশালী ৮ মন্ত্রীসহ মোট ২৪ জনের বিরুদ্ধে গ্যাটকো দুর্নীতি মামলার চার্জশিট অনুমোদন করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। পরে ১৩ মে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়।
এছাড়াও আরাফাত রহমান কোকোর বিরুদ্ধে অবৈধভাবে সম্পত্তি অর্জন ও তথ্য গোপনের অভিযোগে মামলা দায়ের করে দুর্নীতি দমন কমিশন।
তথ্যসূত্র: সংবাদ, ৩ ডিসেম্বর ০৮